মঙ্গলবার, ১১ জুন, ২০১৩

মুসলিমদের সাথে যুদ্ধরত দেশসমূহের জনসাধারণকে হামলার লক্ষ্যবস্তু বানানো

মুসলিমদের সাথে যুদ্ধরত দেশসমূহের জনসাধারণকে হামলার লক্ষ্যবস্তু বানানো _শাইখ আনোয়ার আল-আওলাকি (রাহিমাহুল্লাহ)
মে 18, 2013 by gurabamedia

আমাদের পাঠকদের কাছে থেকে যেসব প্রশ্ন পাই তার উত্তর প্রদানের জন্য ইন্সপায়ার ম্যাগাজিন আমার সাথে একটি ভিডিও রেকর্ডিং করার অভিমত ব্যক্ত করেছে। সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন করা হয়েছে মুসলিমদের সাথে যুদ্ধরত দেশসমূহের বেসামরিক জনসাধারনকে লক্ষ্যবস্তু করে হামলার শরিয়াহগত বৈধতা নিয়ে। বিষয়টি বিভ্রান্তির জালে আচ্ছন্ন। অধিকন্তু বর্তমান সময়ের জিহাদে এটার গুরুত্ব ও সম্পৃক্ততার কারণে এ প্রশ্নের উত্তরে কুরআন, সুন্নাহর আলোকে এবং রাসুল (সাঃ), তাঁর সাহাবী এবং পরবর্তিতে মুজাহিদিনদের জিহাদের বিভিন্ন কর্মপন্থা থেকে আমি এই প্রবন্ধটি লিখছি। একই সাথে আমরা বর্তমান সময়ে জিহাদের বাস্তবতাটা দেখব এবং এতে সফল হওয়ার জন্য কোন পদ্ধতিতে যুদ্ধ চালিয়ে নেয়া দরকার তাও দেখার চেষ্টা করব।



এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট মাসআলা (ফিকহ) গুলোর সার-সংক্ষেপ আমি তুলে ধরছি –

* স্কলারগণ দারুল হারবের জনগনকে সামরিক এবং বেসামরিক লোক এ দু’ভাগে ভাগ করেছেন।
* সামরিক লোকদেরকে লক্ষ্যবস্তু করে হামলা করা যাবে সকল স্কলারগন এই ব্যাপারে একমত। অন্যদিকে বেসামরিক লোকজন এই ব্যাপারে জটিলতার সৃষ্টি করেছে।

* নারী এবং শিশুদের ইচ্ছাকৃতভাবে হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা যাবে না – এ ব্যাপারে স্কলারগণ একমত।

* বৃদ্ধ, কৃষক, ব্যবসায়ী এবং দাসদের ব্যাপারে কি পদক্ষেপ নেয়া যায় এ ব্যপারে স্কলারগণের মধ্যে মতপার্থক্য আছে।

* কিন্তু যদি নারী, বৃদ্ধ, কৃষক, ব্যবসায়ী কিংবা দাসরা যদি মুসলিমদের বিপক্ষে যুদ্ধে শক্তিপ্রয়োগ করে প্রত্যক্ষভাবে যুদ্ধ করে, অর্থনৈতিকভাবে সাহায্য করে কিংবা মতামত জ্ঞাপন করে বুদ্ধিভিত্তিক কোনো সাহায্য প্রদান করে- তবে তাদের উপর হামলা করা বৈধ হয়ে যায়।

* সামরিক আর বেসামরিক লোকজন যদি একত্রে মিশে থাকে তবে সেখানে হামলার ব্যাপারে অনুমতি আছে যদিও নারী, শিশু, বৃদ্ধ, কৃষক, ব্যবসায়ী কিংবা দাস নিহত হতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে এ হামলা যেন সামরিক লোকদের সাথে যুদ্ধের নিয়্যতেই হয়।

* মুসলিমদের দ্বারা যুদ্ধাবস্থায় কোন বেসামরিক লোক যদি নিহত হয় তবে এর দায়ভার মুসলিমদের উপর বর্তাবে না। এর জন্য মুসলিমদের কোনো শাস্তি দেয়া যাবে না, হত্যার কোনো রক্তপণ দেয়া লাগবে না, এবং আল্লাহ্‌র দৃষ্টিতেও এখানে মুসলিমদের কোনো পাপ নেই।

* যদি অনিচ্ছাকৃতভাবে কিংবা যুদ্ধাবস্থায় ভুলবশত কাফেরদের সাথে মুসলিমও মারা যায় তবে যে মুসলিমরা এ হত্যার সাথে সংশ্লিষ্ট তাদের এজন্য কোনো পাপ হবে না কিন্তু কাফফারা আদায় করতে হবে। এই কাফফারা হোল দু’মাস সাওম পালন করা অথবা ষাট জন মিসকীনকে খাওয়ানো। রক্তপণ আদায় করতে হবে কিনা এ ব্যাপারে মতপার্থক্য রয়েছে।

* বেসামরিক লোকজন যদি যুদ্ধে বন্দী হয় তবে তাদের হত্যা করা উচিত না।

* কাফেররা আমাদের নীতিমালা আমাদের বিরুদ্ধে আমাদের বিপদে ফেলার জন্য ব্যবহার করবে-ইসলাম এই সুযোগ দেয় না।

* আলেমগণ যখন জিহাদের ফতোয়া দিবেন, সে ক্ষেত্রে চলমান জিহাদ বিবেচনা করে মুসলিমদের বিজয়কে সবসময় অগ্রাধিকার দেয়া উচিত। বেসামরিক লোকদের হত্যার নিষিদ্ধতার ব্যাপারে নিচে কয়েকটি হাদিস উদ্ধৃত করা হোল।

* উমার (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, রাসুল (সাঃ) নারী এবং শিশুদের হত্যা করতে নিষেধ করেছেন।[১]
* রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন ‘বৃদ্ধ, নারী কিংবা শিশুকে হত্যা করোনা।[২]

* রাসুলুল্লাহ (সাঃ) যুদ্ধের এক নিহত মহিলাকে দেখতে পেলেন এবং বললেন ‘সে তো যোদ্ধা নয়’।[৩]
যেসব কাফেররা মুসলিমদের সাথে যুদ্ধাবস্থায় আছে আমাদের আলেমগণ তাদেরকে ‘মুকাতিলাহ’ এবং ‘গায়রে মুকাতিলাহ’ পরিভাষা দুটো ব্যবহার করে আলাদা ভাগে ভাগ করে থাকেন যার অনুবাদ করলে দাঁড়ায় সামরিক আর বেসামরিক জনসাধারণ। কাফেরদের নারী এবং শিশুদের ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করা যাবে না- এ ব্যাপারে আলেমগনের ইজমা আছে। তবে এখানে “ইচ্ছাকৃতভাবে” এই শব্দটি ব্যখ্যা করা প্রয়োজন কারণ এখানে বুঝার ঘাটতি থাকার কারণে নানা ধরণের বিভ্রান্তির জন্ম নেয় যেটা আজকে আমরা চারপাশে লক্ষ্য করছি। এখানে যেটা বুঝানো হয়েছে তা হলো হত্যার জন্য নারী এবং শিশুদের আলাদা করে বেছে নেয়া যাবে না; নারী এবং শিশু যুদ্ধে বন্দি হলে তাদের হত্যা করা উচিত নয় এবং যুদ্ধাবস্থায় ও যদি তাদের সামরিক বাহিনীদের থেকে আলাদা করা সম্ভব হয় তবে তা করা উচিত। কিন্তু তার মানে এই না যে, পুরুষ-নারী-শিশু সবাই একত্রে মিশে থাকলে তাদের উপর হামলা ইসলামে নিষিদ্ধ। এই ধারণা খুবই বিপদজনক এবং জিহাদের জন্য ক্ষতিকর এবং এই ব্যাপারে সতর্ক থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ণ। মুসলিমদের সাথে যুদ্ধরত কাফেরদের মাঝে নারী-শিশু মিশে আছে বলে তাদের উপর হামলা করা বন্ধ করা খুবই কঠিন কাজ যা বর্তমান জিহাদের সীমাকে খুবই সংকীর্ণ করে ফেলে; একই সাথে এভাবে যুদ্ধ করা অসম্ভব এবং শত্রুদের তুলনায় মুসলিমরা অনেক অসুবিধাজনক পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়ে পড়ে। শত্রুপক্ষের বাড়িঘর আক্রমণ এবং তাদের শহর অবরোধ করা সম্পর্কে আলেমদের অভিমতসমূহ দেখলে আমরা বিষয়টি যথাযথভাবে বুঝতে সক্ষম হব। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর সময়ে ‘বায়াত’ নামক এক ধরনের যুদ্ধ পদ্ধতি ছিল। এটা ছিল রাতের অন্ধকারে শত্রুপক্ষের উপর হামলা করা। আক্রমণকারীরা অতর্কিতভাবে শত্রুদের বাড়িঘরে কিংবা তাবুতে হামলা করত এবং লড়াইয়ে লিপ্ত হত। এ কারণে ঘরে কিংবা তাবুতে অবস্থানরত নারী-পুরুষ-শিশু নির্বিশেষে নিহত হত কারণ এর মাঝে নারী-পুরুষ-শিশু পার্থক্য করা খুবই কঠিন। এখন, এ ধরণের যুদ্ধ কি ইসলাম অনুমোদন করে? ‘বায়াত’ যুদ্ধে নারী-শিশুরা যে হামলার শিকার হচ্ছে এ ব্যপারে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। একটি সহিহ বর্ণনায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন “তারা তাদেরই অন্তর্ভুক্ত”। অর্থাৎ হত্যার অনুমতির ব্যাপারে যুদ্ধরত পুরুষদের উপর যে হুকুম তাদের ক্ষেত্রেও অনুরূপ। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) তার সাহাবীদের এই ধরনের যুদ্ধের অনুমতি প্রদান করেছেন যেখানে পুরো পরিবারই নিহত হচ্ছে। সালামাহ (রাঃ) বলেন, ‘আমি নিজে নয়টি পরিবারের সকল লোককে হত্যা করেছি’।[৪] ইমাম আহমদ (রহঃ) কে ‘বায়াত’ এর ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। তিনি বলেন ‘এবং রোমানদের বিরুদ্ধে বায়াত ছাড়া কি কোনো যুদ্ধ হয়েছিল?’[৫]

অর্থ্যৎ ইমাম আহমদ (রহঃ) বায়াত এর সমর্থন করছেন শুধু তাই নয়, তিনি আরো বলছেন যে মুসলিমরা রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রায়শ যে পদ্ধতি অবলম্বন করেছে তা হল ‘বায়াত’। যে দেশগুলো আজ মুসলিমদের সাথে যুদ্ধাবস্থায় আছে সেখানকার কোনো জনবহুল এলাকায় বোমা নিক্ষেপ কিংবা বিস্ফোরণ আর ‘বায়াত এর মাঝে কার্যত কোন পার্থক্য নেই’। যেমনিভাবে সাহাবারা এবং পরবর্তীতে তাদের অনুসারীদের জন্য পুরুষ-নারী-শিশু আলাদা করতে না পারা সত্ত্বেও এই ‘বায়াত’ যুদ্ধের অনুমতি ছিল তবে কেন আমরা কাফেরদের (মুসলিমদের সাথে যুদ্ধরত) দেশের কোন জনবহুল এলাকায় বোমা নিক্ষেপ নিষিদ্ধ করব? ‘বায়াত’ এর ব্যাপারে স্কলারগণের ইজমা (ঐক্যমত) থাকার বিষয়টি আমরা ইমাম আহমদের (রহঃ) আরেকটি বক্তব্য থেকে জানতে পারি। ইমাম আহমদ (রহঃ) বলেন “আমরা এমন কারো কথা জানিনা যিনি ’বায়াত’ কে নিরুৎসাহিত করেছেন।’[৬]

আমাদের আলোচনার সাথে সংশ্লিষ্ট আরেকটি উদাহরণ হলো যুদ্ধে ব্যবহৃত গুলতি (ভারী পাথর নিক্ষেপের যুদ্ধাস্ত্র বিশেষ) যা কাফেরদের শহরে হামলার জন্য ব্যবহৃত হত। সিরাহ বর্ননাকারী আলেমগণ উল্লেখ করেছেন যে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) তায়িফে (তায়িফে প্রচীর দিয়ে ঘেরা ছকীফ আক্রমনের সময়) গুলতি ব্যবহার করেছিলেন এবং আমর ইবনে আস (রাঃ) ও মিশরের আলেক্সান্দ্রিয়ায় যুদ্ধের সময় এটা ব্যবহার করেন। গুলতির নিক্ষিপ্ত বস্তু (বড় বড় পাথর বা আগুনের গোলা কিংবা অন্য কোন বস্তু) নগরীতে আঘাত হানে এবং এতে নারী-পুরুষ কিংবা শিশুদের আলাদা করার কোনো সুযোগ থাকে না। শত্রুদের বিপক্ষে এ ধরনের গুলতি ব্যবহারের ব্যপারে ইবনে রুশদের একটি বাক্য দ্বারা সারমর্মে পৌঁছানো যায়। তিনি বলেন, এই ব্যাপারে আলেমগণের ইজমা আছে যে কাফেরদের দুর্গে গুলতি দিয়ে আক্রমন করা বৈধ যদিও তাদের মাঝে নারী–শিশু থাকুক কিংবা না থাকুক। কারণ আমাদের নিকট দালিল আছে যেখান থেকে জানতে পারি রাসুল (সাঃ) তায়িফে কাফেরদের বিরুদ্ধে গুলতি ব্যবহার করেছিলেন।[৭]

ইমাম শাফেঈ (রহঃ) বলেন “ আমাদের কাছে বর্ণনা আছে যে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) তায়িফে গুলতি ব্যবহার করেছেন। তাই নারী-শিশু তাদের সাথে অবস্থান করছে বলে আক্রমণ করার ব্যাপারে যদি নিষেধাজ্ঞা থাকত তবে রাসুল (সাঃ) তা জানাতেন। তায়িফের এই বর্ণনাসহ অন্যান্য বর্ণনাগুলো এখনও ভালোভাবে সংরক্ষিত আছে যা রাসুল (সাঃ) এর সুন্নাহ এবং সিরাহ থেকে সকলেই জানে। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর সাহাবাগণ এবং তাঁদের অনুসারীরাও আমাদের আগে থেকেই কাফেরদের দুর্গে আক্রমন করতে এটা ব্যবহার করেছেন। এরকম কোন বর্ণনা আমাদের কাছে নেই যা প্রমাণ করে যে তাঁরা নারী-শিশু কিংবা অন্য যে কেউ যাদের সাধারণত হত্যা করা উচিত নয় তাদের অবস্থান করার কারণে গুলতি কিংবা অন্য কোন রকম অস্ত্র দিয়ে নগর-দুর্গ আক্রমণ করা বন্ধ করেছেন। ইমাম আল মাউয়ারদি (রহঃ) বলেন, নারী-শিশুদের হত্যার ব্যপারে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর যে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে তা যুদ্ধে বন্দীদের ক্ষেত্রে প্রয়োগ হবে কারণ এরা যুদ্ধে প্রাপ্ত সম্পদ (গনীমাহ, booty)। কিন্তু যখন এই নারী-শিশু যুদ্ধরত এলাকায় (যুদ্ধের ময়দানে) অবস্থান করে তবে তাদের পুরুষদের সাথে তাদের উপরেও হামলা করা যাবে কারণ যুদ্ধের ময়দানে এ ধরনের আক্রমণ অনুমোদিত।[৮]

তাই প্রয়োজনে এই ধরনের গুলতি বেসামরিক লোকদের ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা যাবে বলে আলেমগণ বলেছেন। ইমাম শাফেঈ (রহঃ) বলেছেন যে, যদি মুসলিমরা দুর্গের কিংবা শহর থেকে বেশ দূরত্বে অবস্থান করে তবে তাদের শুধু দুর্গের প্রাচীরে পাথর কিংবা আগুনের গোলা নিক্ষেপ করা উচিত; কাফেরদের বাড়িঘরের উপরে নয়।[৯]

তবে, যদি প্রাচীরের কাছাকাছি চলে আসে তখন তাদের বাড়িঘরের উপর লক্ষ্য করে নিক্ষেপ করা যাবে। ‘বায়াত’ এর মত এই গুলতির ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বেসামরিক লোকদের জীবন ক্ষতির সম্মুখীন হয়। গুলতি যে গোলা নিক্ষেপ করে তা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যভেদী কোনো অস্ত্র না তাই মুসলিমদের সাথে যুদ্ধরত জাতিসমুহের শহরে বোমা বিস্ফোরণ কিংবা নিক্ষেপ করার সাথে এর কোনো পার্থক্য নেই। তাই উপরোক্ত দুটি দালিল থেকে এটা পরিস্কার যে, মুসলিমদের সাথে যুদ্ধরত দেশের জনসাধারনের উপর মুসলিমদের বোমা বিস্ফোরণ, রাইফেল বা বন্দুক কিংবা অন্য কোনো উপায়ে হামলা করা জায়েজ যদিও তা তাদের বেসামরিক লোকদের মৃত্যুর কারণ হোক না কেন। লক্ষ্য করবেন, ‘শত্রুরা আমাদের সাথে যে আচরণ করবে আমরাও সে আচরন করব’, এই ব্যাপারে এখনো আমি কোন দালিল উপস্থাপন করিনি। পশ্চিমা বিশ্ব মুসলিমদের উপর যে হামলা চালিয়েছে এই দালিল নিয়ে আসলে তাদের জনসাধারনের পক্ষে যারা আজ তর্ক করছে তাদের কথা বলার কোনো সুযোগই থাকবে না। মূল দালিলগুলোর দিকে নজর দেয়া গুরুত্বপূর্ণ যেগুলোর উপর ভিত্তি করে আমাদের মূলধারার (ক্লাসিকাল, পুর্বের) আলেমগণ জিহাদের ব্যাপারে ফতোয়া প্রদান করেছেন তবেই আমরা বুঝতে পারব বর্তমান সময়ের আলেমদের তুলনায় কেন তারা ভিন্ন উপসংহারে এসে উপনীত হয়েছিলেন।

ইমাম আবু জাকারিয়া আল আনসারি (রহঃ) বলেন, ‘কাফেরদের দুর্গ আক্রমণের উদ্দেশ্যে গুলতি ব্যবহার করা যাবে যদিও তা বেসামরিক লোকদের উপর আঘাত হানে যেন তারা জিহাদকে থমকে দিতে এদের (বেসামরিক) ব্যবহার করতে না পারে অথবা তাদের (বেসামরিক) দিয়ে দুর্গ রক্ষার ছলচাতুরী করতে না পারে।’[১০]

ইমাম নববী (রহঃ) বলেন, ‘কোন শহর কিংবা দুর্গে যদি কোনো মুসলিম, মুসলিম যুদ্ধবন্দী, ব্যবসায়ী, কিংবা শান্তি চুক্তিবদ্ধ কাফের থাকে কিংবা উপরে উল্লিখিতদের কোনো দল থাকে তবে সেখানে গুলতি কিংবা অনুরূপ কোনো কিছু দিয়ে কি আঘাত হানা যাবে? ফিকহের মাযহাবসমুহ এ ব্যপারে কয়েকটি মত দিয়েছে। প্রথমত, যদি তাদের আক্রমণ করার প্রয়োজন না হয় তবে এ ব্যাপারে শক্তিশালী মত হচ্ছে আক্রমণ না করা। তবে, তা নিষিদ্ধ করা হয় নি। এর কারণ হল অবিশ্বাসীদের মধ্যে একজন মুসলিম থাকার কারনে যেন জিহাদ থেমে না যায়। যদি কোনো ক্ষয়-ক্ষতির আশঙ্কা থাকে অথবা তাদের দুর্গে প্রবেশের অন্য কোন উপায় না থাকে তবে নিঃসন্দেহে তাদের উপর আক্রমন করা বৈধ। মাজহাবের দ্বিতীয় মত অনুযায়ী কোন ধরনের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করার দরকার নেই। যদি তাদের আক্রমনের ফলে কোন মুসলিম মারা যাওয়ার আশঙ্কা থাকে তবে তাদের আক্রমন করা উচিত হবে না, আর আশঙ্কা না থাকলে সেখানেও দুইটি মত আছে। তৃতীয় মত যা আল-শামিল এর লেখক উল্লেখ করেছেন তা হল যদি সেখানে মুসলিমদের সংখ্যা তাদের সমান হয় তবে তাদের আক্রমন করা আমাদের উচিত হবে না। কিন্তু মুসলিমদের সংখ্যা যদি কম হয় তবে আমরা তাদের আক্রমন করতে পারব, কারণ সেক্ষেত্রে সিংহভাগ ক্ষতি মুসলিমদের হবে না। এ ব্যাপারে মাজহাবের অবস্থান যা আল-মুখতাসার এ উল্লেখ করা আছে তা হল, তাদের আক্রমন করা বৈধ যদিও সেখানকার মুসলিমদের ক্ষতি হয়, কারণ আমাদের পক্ষের মুসলিমদের পবিত্রতা সেখানকার মুসলিমদের চেয়ে বেশি। যদি কোন মুসলিম নিহত হয় তবে সে শহীদ হবে।’[১১]

ইমাম ইবনে কুদামাহ আল মাক্বদিসি (রহঃ) বলেন, ‘যদি তারা (শত্রুরা) যুদ্ধে নারী শিশু বা অন্য কাউকে তাদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তবে যোদ্ধাদের মারার উদ্দেশ্যে তাদের লক্ষ্য করে আঘাত করা বৈধ। এর কারণ রাসূল (সাঃ) তাদের মধ্যে নারী-শিশু থাকা সত্ত্বেও গুলতি ব্যবহার করেছিলেন। এর কারণ হল, যদি এই কারণে মুসলিমরা তাদের আক্রমন না করে তবে তা জিহাদে সমস্যার সৃষ্টি করবে। কারণ, শত্রুরা যখনই মুসলিমদের হুমকির সম্মুখীন হবে তখনই তারা এইটাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করবে। যুদ্ধের সময়ে যেকোনো মূহুর্তেই আঘাত করা বৈধ। যুদ্ধ চলাকালীন সময়ের জন্যই অপেক্ষা করতে হবে এমন কোনো কথা নেই। রাসূল (সাঃ) আঘাত হানার সময় যুদ্ধ শুরু হওয়ার অপেক্ষায় বসে থাকেননি।’[১২]

ইমাম ইবনে কুদামাহ আল মাক্বদিসি (রহঃ) আরও বলেন, ‘আলী ইবনে আবি তালিব হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সাঃ) আত-তায়িফের অধিবাসীদের বিরুদ্ধে গুলতি ব্যবহার করেছিলেন। শত্রুকে পানি দিয়ে ভাসিয়ে দেওয়ার কৌশলটিও একই ধাঁচের। যদি তাদের মাঝে মুসলিম অধিবাসী থাকে এবং এসকল কৌশল ব্যবহার না করেই জয়লাভ করা যায় তবে সেগুলো ব্যবহার না করাই উচিত হবে। কারণ এতে অপ্রয়োজনীয় রক্তপাত হবে। কিন্তু যদি এই কৌশল গুলো ছাড়া জয়লাভ করা না যায় সেক্ষেত্রে এসকল কৌশল ব্যবহার করা বৈধ। কারণ এগুলোকে নিষেধ করলে তা প্রকারান্তরে জিহাদকেই নিষ্ক্রিয় করে দিবে।’[১৩]

জিহাদ চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারটি যে অন্যান্য বিষয়গুলোর চেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ তা তুলে ধরার জন্যই আমাদের প্রাথমিক যুগের আলেমদের কিছু উদ্ধৃতি তুলে ধরা হলো। এর মাধ্যমে এও প্রমাণিত হয় যে, যে সকল বিষয় জিহাদকে নিষ্ক্রিয় করে দেওয়ার ঝুঁকির সম্মুখীন করে তার সবকিছুই রহিত হয়ে যাবে। অনেক আধুনিক আলেমরা কিছু অপরিবর্তনীয় নীতিমালার অবতারণা করেছেন যা অনুসরণ করতে গেলে জিহাদ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে কিংবা মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত নীতি নৈতিকতাহীন শত্রুদের বিপক্ষে মুসলিমরা অসুবিধাজনক অবস্থানের মুখোমুখি হবে।



জিহাদের ব্যাপারে বর্তমানকালের (কথিত) আলেমদের কিছু নিষেধাজ্ঞা নিম্নরুপঃ

• রাজা বা প্রেসিডেন্টের/ খলিফার নির্দেশ ছাড়া জিহাদ করা যাবে না।

• আত্মঘাতী হামলা বৈধ না।

• অবিশ্বাসী নারী-শিশুর মৃত্যুর কারণ হতে পারে এমন সকল অভিযান অবৈধ।

প্রথম নিষেধাজ্ঞাটিই জিহাদ থামিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। কারণ বর্তমানকালের কোনো রাজা বা রাষ্ট্রপতি (যারা নিজেরাই মুরতাদ) জিহাদের অনুমতি দিবে না। তারা শুধু সেসকল যুদ্ধের অনুমতি দিবে যেগুলো তাদের নিরাপত্তা দিবে এবং তাদের ব্যক্তিগতভাবে লাভবান করবে। আল্লাহ্‌র রাস্তায়, ইসলামের উন্নতির জন্য কিংবা মুসলিমদের প্রতিরক্ষার জন্য যুদ্ধের ব্যাপারে তারা খুব একটা আগ্রহী নয়। বাকি দুটো নিষেধাজ্ঞা এখনকার মুজাহিদীনদের জন্য সম্ভাব্য অধিকাংশ কৌশলকেই অবৈধ করে দেয়। ইমান ইবনু রুশদ বলেন যে, নারী-শিশুর উপস্থিতি নির্বিশেষে শত্রুর দুর্গে গুলতি ব্যবহার করার ব্যাপারে ফিকহশাস্ত্রবিদদের মধ্যে ইজমা রয়েছে। ইমাম আল-শাফেঈ (রহঃ) বলেন, এটাই মুসলিমদের এবং মুহাম্মাদ (সাঃ) এর সাহাবিদের অনুসৃত পন্থা ছিল। কাফিরদের দুর্গ আক্রমণের ব্যাপারে এমন কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না যেখানে নারী-শিশু বা অন্য কারো নিহত হওয়া ঠেকাতে গুলতি বা এ ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করা নিষেধ করা হয়েছে।

ইমাম আহমাদ (রহঃ) বলেছেন, ‘রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বায়াত ছাড়া আর কী?’ অনিচ্ছাকৃতভাবে নারী-শিশু মারা গেলেও কাফিরদের ভূমি আক্রমণের ক্ষেত্রে রাসূল (সাঃ) এর কৌশল এমনই ছিল। খুলাফায়ে রাশিদিন, উমাইয়া, আব্বাসীয় এবং আইয়্যুবী খলিফা, স্পেইনের মুসলিম এবং মামলুকরাও রোমানদের সাথে যুদ্ধে এই কৌশল অবলম্বন করত। উসমানিরাও কাফিরদের শহর-নগর অবরোধের সময় এই পন্থা কাজে লাগাত। তাহলে কীভাবে আমরা ১৪০০ বছরের যুদ্ধ কৌশল জানালা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে আজকের যুগে জিহাদের নতুন নিয়ম বানাতে পারি? মুসলিমরা যা করেনি তা হলো তারা ইচ্ছাকৃতভাবে বা আত্মসমর্পণ করার পর বন্দী অবস্থায় তাদের হত্যা করেনি। এই বিষয়ে পরিস্কার ধারণা রাখা এই যুগে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বেসামরিক লোকের মৃত্যু ঠেকাতে গেলে অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভাব্য লক্ষ্যে আক্রমণ চালানো বন্ধ হয়ে যাবে। আর শুধুমাত্র সুরক্ষিত সামরিক লক্ষ্যে আক্রমণ করাটা আমাদের মুজাহিদীন ভাইদের সমস্যায় ফেলে দিবে।



উপরোক্ত প্রমাণ অনুযায়ী যে সকল যুদ্ধ কৌশল বৈধঃ

• মুসলিমদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত দেশসমূহের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বিস্ফোরক ব্যবহার করা বৈধ। বিস্ফোরক দ্রব্যের প্রভাব গুলতির সাথে তুলনীয়। গুলতি দিয়ে ছোঁড়া মিসাইলগুলো ছিল প্রধানত পাথর। এই পাথরের আঘাতে বা এর বিক্ষিপ্ত অংশের আঘাতে শত্রুরা আক্রান্ত হত। কখনো কখনো গুলতির মিসাইল হিসাবে দাহ্য পদার্থে পূর্ণ পাত্র ব্যবহার করা হত যা শত্রুদের আগুনে পুড়িয়ে মারত। কিছু সংখ্যক আলেম বিস্ফোরক এর ব্যবহার কে শত্রুর বিরুদ্ধে আগুনের ব্যবহারের সমতুল্য বলেছেন, কিন্তু তা পুরোপুরি সঠিক নয়।[১৪]

এটা সত্য যে বিস্ফোরক প্রচুর তাপ উৎপন্ন করে তবে বেশিরভাগ মৃত্যুই হয় ছোড়া পাথরের বিক্ষিপ্ত অংশ এবং বিস্ফোরনের কম্পনে। বিস্ফোরণের তাপের ফলে সবচেয়ে কম সংখ্যক মানুষ হতাহত হয়। প্রায় সব বিস্ফোরকের ক্ষেত্রে একই ঘটনা ঘটে। মৃত্যুর কারণ তাপ হোক কিংবা ছোড়া পাথরের বিক্ষিপ্ত অংশ হোক আইনগত দিক থেকে বিস্ফোরক এর ব্যবহার গুলতি ব্যবহারের অনুরূপ।

• বিভিন্ন অপারেশানে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যাবহারের অনুমতি রয়েছে যেমনটা মুম্বাই হামলায় ব্যবহার করা হয়েছিল সাধারণ জনগনকে লক্ষ্য করে। এটি উপরে আলোচিত বায়াত কৌশলের অনুরুপ। যে গুলি করবে সে ভীড়ের মধ্যে এলোপাতাড়ি ভাবে গুলি করতে পারবে তবে লক্ষ্য যদি পরিস্কার থাকে অবশ্যই তাকে নারী এবং শিশু হত্যা এড়িয়ে যেতে হবে।

• জনবহুল স্থান গুলোতে বিষাক্ত গ্যাস কিংবা রাসায়নিক পদার্থ এবং বায়োলজিকাল অস্ত্র ব্যবহারের অনুমোদন রয়েছে এবং শত্রুর বিরুদ্ধে ব্যাপক কার্যকারিতার বিবেচনায় এদের ব্যবহারের পক্ষে জোর সমর্থন দেওয়া হয়েছে।



এই ধরনের অস্ত্র ব্যবহারের গুরুত্ব এবং অনুমোদনযোগ্যতার উপর ভিত্তি করে পূর্ববর্তী আলেমগণরা যা বলেছেনঃ

-ইমাম আল মাওয়ার্দি (রহঃ) বলেন, ‘রাসূল (সাঃ) মক্কা বিজয়ের পর আত-তায়িফ অবরোধ করার সময় গুলতি ব্যবহার করেছিলেন। শত্রুদের অসতর্ক অবস্থায় তাদের উপর (তারা যে সকল শহর বা গ্রামে থাকে) অতর্কিতে হামলা করার অনুমতি আছে যেমনটা রাসূল (সাঃ) করেছিলেন বানিয়াল মুস্তালাকদের বিরুদ্ধে। শত্রুদের উপর রাতের বেলায় হামলা করা, তাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়া, তাদের দিকে আগুন নিক্ষেপ করা, সাপ এবং বিছা নিক্ষেপ করাও বৈধ। তাদেরকে ভিতরে রেখে তাদের বাড়ি ঘর ধ্বংস করে ফেলা, পানির তোড়ে ভাসিয়ে দেওয়া, তাদের পানির সরবরাহ বন্ধ করে দেয়া, এবং যা যা তাদের ধ্বংসের কারণ হতে পারে তার সবই করার অনুমতি রয়েছে। তাদের উপর ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে যেতে হবে এতে হয়ত তাদের নারী ও শিশুদের মৃত্যু হতে পারে তবে শুধু এ থেকে বিরত থাকতে গিয়ে অর্থাৎ শুধুমাত্র এই কারণে তাদের উপর আক্রমণ চালানো বন্ধ করা যাবেনা। এর কারণ হল রাসূল (সাঃ) নারী এবং শিশুদের কারণে বনি মুস্তালাক অথবা আত-তায়িফ এর উপর আক্রমণ পরিচালানা বন্ধ রাখেননি। তবে রাসূল (সাঃ) নারী এবং শিশুদের কে ইচ্ছাকৃত ভাবে হত্যার করার নির্দেশ দেননি। নারী এবং শিশুদের গণিমতের মাল হিসেবে পাওয়া গেলেও হত্যা করা যাবেনা। শুধুমাত্র যখন তারা দারুল-হারবে বসবাস করবে তখন তাদের দিকে লক্ষ্য করে আক্রমণ করা হালাল এবং তাদের ক্ষেত্রেও পুরুষদের মতো একই নিয়ম প্রযোজ্য হবে।’[১৫]

-ইমাম আল-সারখাশি (রহঃ) (একজন হানাফী আলেম) শারহ আল-সায়রাল কাবির থেকে মুহাম্মদ ইবন আল-হাসান (রহঃ) এর একটি উদ্ধৃতি দেনঃ আগুন দিয়ে অবিশ্বাসীদের ভবন পুড়িয়ে ফেলা, তাদেরকে পানি দিয়ে ভাসিয়ে দেওয়া, তাদের পানিতে রক্ত বর্জ্য এবং বিষ মিশানো যতক্ষন পর্যন্ত না পানি দূষিত হচ্ছে- এসব মুসলিমদের জন্য অনুমোদিত। কারণ আল্লাহ আমাদের আদেশ করেছেন তাদের কাবু করতে এবং তাদের শক্তিমত্তাকে অকার্যকর করে দিতে। এ যাবৎ যুদ্ধের যত গুলো কৌশলের কথা বলা হল এর সব গুলোই তাদের কে দুর্বল করে তুলবে এবং এর ফলে আল্লাহর আদেশ পালিত হবে এবং আল্লাহ কে অমান্য করা হবেনা। এই সব কৌশল শত্রুকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে এবং এগুলো হল পুরস্কার প্রাপ্তির একটা উপায়।

আল্লাহ্‌ বলেন, ‘তাদের এমন পদক্ষেপ যা কাফেরদের মনে ক্রোধের কারণ হয় আর শত্রুদের পক্ষ থেকে তারা যা কিছু প্রাপ্ত হয়- তার প্রত্যেকটির পরিবর্তে তাদের জন্য লিখিত হয় নেক আমল।’[১৬]

কোনো মুসলিম বন্দি, শান্তি চুক্তিতে আবদ্ধ কোনো জাতির নাগরিক, নারী-শিশু-বৃদ্ধ কেউ আছে এটা জানা থাকার পরেও উপরে বর্ণিত কোনো পদ্ধতিই নিষিদ্ধ হয়ে যায় না। কারণ এক্ষেত্রে একই সাথে তাদের ক্ষয়-ক্ষতি এড়ানো এবং কাফিরদের অবদমিত করার নির্দেশ পালন করা সম্ভব নয়। আর যা এড়ানো সম্ভব নয় তা মাফ করে দেওয়া হবে।

-ইমাম ইবনু ফারহুন (রহঃ) (মালিকি মাযহাবের আলেম) বলেন, ‘শত্রুকে সকল উপায়ে মোকাবিলা করতে হবে। তাদের থেকে ক্ষতির আশঙ্কা থাকলে যদি অন্য কোনো উপায় না থাকে তবে আগুন দিয়ে হলেও মোকাবিলা করতে হবে। তাদের থেকে ক্ষতির আশঙ্কা না থাকলে সেক্ষেত্রে দুটি মত রয়েছে। তবে ভেতরে মুসলিমরা থাকলেও তাদের জাহাজ এবং দুর্গ গুলতি দিয়ে আঘাত করা আমাদের জন্য বৈধ। এবং এ ব্যাপারে তর্কের কোনো অবকাশ নেই।’[১৭]

-ইমাম আল-খারশি (রহঃ) (মালিকি মাযহাবের আলেম) বলেন,’ আমাদের দাওয়াত গ্রহণ না করলে সম্ভাব্য সকল উপায়ে শত্রুর মোকাবিলা করা বৈধ। তাদের পানি সরবরাহ আটকে দিয়ে তৃষ্ণায় মেরে ফেলা, পানির তোড়ে ডুবিয়ে দেওয়া, তলোয়ার, ছুরি দিয়ে আঘাত করে কিংবা গুলতি এবং অন্যান্য অস্ত্র দিয়ে মেরে ফেলা বৈধ।’[১৮]

-ইমাম আল-শাফেঈ (রহঃ) বলেন, ‘শত্রুপক্ষ পাহাড়, দুর্গ, গিরিখাত, কিংবা কাঁটাযুক্ত গাছের নিচে বা অন্য কোনো আশ্রয় গ্রহণ করলে তাদের গুলতি, আগুন, বিছে, সাপ এবং ক্ষতিকারক সবকিছু দিয়েই আঘাত করা বৈধ। তাদের ডুবিয়ে মারার উদ্দেশ্যে বা কাদায় আটকে ফেলার উদ্দেশ্যে পানির স্রোতে ভাসিয়ে দেওয়াও বৈধ। সেখানে নারী-শিশু বা ধর্মীয় যাজকেরা থাকুক বা না থাকুক এতে কিছু আসে যায় না। কারণ, সেই ভূমি ইসলাম দ্বারা সুরক্ষিত নয় বা ইসলামের সাথে কোনো চুক্তিতে আবদ্ধ নয়। তাদের ফলের গাছ এবং অন্যান্য বৃক্ষ, বাড়িঘর এবং তাদের মালিকানাধীন জড় যেকোনো বস্তুই ধ্বংস করা অনুমোদিত।’[১৯]

-ইমাম আল-বাহুতি (রহঃ) (একজন হাম্বালি মাযহাবের আলেম) বলেন, ‘তাদেরকে (কাফিরদের) আগুন, সাপ, বিছে, গুলতি দিয়ে আঘাত করা, সুড়ঙ্গ ধোঁয়ায় পূর্ণ করা, বন্যার তোড়ে ডুবিয়ে দেওয়া এবং তাদের দুর্গ ও বাড়িঘর ধ্বংস করা বৈধ। তবে আগুন ব্যবহার না করেই তাদের হারানো গেলে আগুন ব্যবহার থেকে বিরত থাকা উচিত।’[২০]

-ইমাম আল-শাওকানি (রহঃ) বলেন, ‘আল্লাহ অবিশ্বাসীদের হত্যা করার আদেশ দিয়েছেন এবং এর জন্য কোন পদ্ধতি সুনির্দিষ্ট করে দেননি। কি করা যাবে আর কি করা যাবেনা এই বিষয়ে আল্লাহ আমাদের কোন আদেশ দেননি। সুতরাং তাদের কে যে কোন উপায়ে হত্যা করতে কোন রকম বাধা নেই সেটা গুলির মাধ্যমে হোক ছুরিকাঘাতে হোক, পানিতে ডুবিয়ে হোক, তাদের ভবন গুলো তাদের উপর ধসিয়ে দিয়ে হোক কিংবা তাদের কে উঁচু স্থান থেকে ফেলে দিয়ে হোক না কেন।’[২১]

আলেমদের এই বক্তব্যগুলো থেকে দেখা যাচ্ছে, বিষ প্রয়োগ বা মানুষ হত্যার অন্যান্য পদ্ধতি গুলো যে সকল অবিশ্বাসীরা আমাদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত আছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যাবে। এর পাশাপাশি তাদের বক্তব্যগুলোতে আরো অনেক অন্তর্নিহিত তাৎপর্য রয়েছে যা থেকে একজন বিশ্বাসী লাভবান হতে পারে।

মুজাহিদীনদের উচিত মুসলিমদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত দেশগুলো বিশেষ করে যারা নেতৃত্ব দিচ্ছে যেমন- ইউ.এস.এ, ব্রিটেন এবং ফ্রান্স প্রভৃতিকে লক্ষ্য করে বিস্ফোরক, বিষ, আগ্নেয়াস্ত্র এবং অন্যান্য সকল উপায়ে আক্রমণ চালানো এবং তাদের সর্বোচ্চ ক্ষতি করা। আমাদের এই সময়ে আল্লাহ্‌র ইবাদাত করার এটি একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপায়।

gurabamedia.wordpress.comhttp://gurabamedia.wordpress.com

যারা সরকারের স্বার্থরক্ষায় ফতোয়া প্রদানে ব্যস্ত

নিদাল হাসান যা করেছে, ঠিকই করেছে – শেইখ আনোয়ার আল আওলাকি
মে 23, 2013 by gurabamedia

বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম
আমরা আজ ইসলামের পক্ষে কর্মরত আলেম নয়, বরং সরকারের-দালাল আলেমদের দেখি, যারা সরকারের স্বার্থরক্ষায় ফতোয়া প্রদানে ব্যস্ত। এহেন যুগে ইমাম আনোয়ার আল আওলাকি একজন সত্যবাদী স্কলার। আমেরিকান নাগরিক, মার্কিন সেনাবাহিনীর একজন সৈন্য নিদাল হাসান যখন তাঁর মুসলিম ভাইবোনদের প্রতিরক্ষায় ইরাক ও আফগানিস্তানে মুসলিমদেরকে হত্যা করতে পাঠানো হবে এমন একটি মার্কিন সৈন্যদলের উপর হামলা করে, তখন তাঁর বিরুদ্ধে কাফিররা তো বটেই এমনকি আমেরিকান মুসলিম জনগোষ্টি পর্যন্ত অভিযোগ করতে থাকে! এই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতে সত্য কথা বলার সত্ সাহস দেখিয়েছিলেন শেইখ আনোয়ার আল আওলাকি, পরবর্তীতে যিনি আমেরিকার রোষের স্বীকার হন এবং আমেরিকান ড্রোন হামলায় মৃত্যুবরণ করেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাকে শহীদ হিসেবে কবুল করুক এবং আমাদেরকে তাঁর পথ অনুসরণের তওফিক দিন আমীন!

============

নিদাল হাসান যা করেছে, ঠিকই করেছে

============

নিদাল হাসান একজন প্রকৃত বীর। তিনি একজন বিবেকসম্পন্ন ব্যক্তি, যিনি এমন অসংগতিপূর্ণ একটি জীবন মেনে নিতে পারেন নি যেখানে নিজে একজন মুসলিম হয়ে, তাকে সেই সেনাবাহিনীর পক্ষে চাকরি করতে হবে, যারা তাঁর আপন লোকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে। এই অসংগতির কথা উঠলেই, বহু মুসলিম একে ঝেড়ে একপাশে ফেলে দেয় আর ভান করে যেন এরকম কোন কিছুর অস্তিত্বই নেই। কোন সচ্চরিত্রবান মুসলিমেরপক্ষে এটি সম্ভব নয় যে, সে তার সৃষ্টিকর্তা ও তার মুসলিম ভাইবোনের প্রতি নিজেরদায়িত্ব সম্পর্কে অবগত হবার পরেও, একজন মার্কিন সৈন্য হিসেবে আমেরিকার খেদমত করতে থাকবে। এই আমেরিকাই আজ সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নেতৃত্ব প্রদান করছে, যা মূলত ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। এর সেনাবাহিনীরা আজ সরাসরি দুইটি মুসলিম রাষ্ট্রে আক্রমণ চালাচ্ছে, আর তাদের হাতের পুতুল সরকার দিয়ে অবশিষ্ট যেসব মুসলিম রাষ্ট্র আছে, সেগুলোও দখল করে রেখেছে।

নিদাল সেই সেনাবাহিনীদের উপর গুলিবর্ষণ করেছেন, যারা ইরাক এবং আফগানিস্তানে অগ্রসর হবার পথে ছিল। সুতরাং তিনি যা করেছেন, সে কাজের বিশুদ্ধতা নিয়ে কীভাবে কোন মতবিরোধ থাকতে পারে? বরং সত্যি বলতে, একজন মুসলিম তার মার্কিন সেনাবাহিনীতে একজন সৈন্য হিসেবে কাজ করার সিদ্ধান্তকে ইসলামী শরীয়াহ মোতাবেক একমাত্র একভাবেই যথার্থ প্রমাণ করতে পারেন, তা হলো যদি তার নিয়্যত বা উদ্দেশ্য হয় নিদালের মতো পুরুষদেরপদাংক অনুসরণ করা।

ভাই নিদালের এই বীরত্বপূর্ণ আচরণের মাধ্যমে আমেরিকান সমাজের উভয় সংকটে পড়া মুসলিমদের বাস্তব প্রতিচিত্র ফুটে উঠেছে। নিজেদের অবস্থান সম্পর্কে উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠা মুসলিমদের সংখ্যা দিনে দিনে বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাদেরকে এমন একটি অবস্থান নিতে হবে যাতে করে, হয় তাদেরকে ইসলামের সাথে প্রতারণা করতে হবে, নাহয় দেশ/জাতির সাথেপ্রতারণা করতে হবে। অনেকেই আজ এ দু’টির মাঝে প্রথমটিকে বেছে নিচ্ছে। আমেরিকাস্থ মুসলিম সংগঠনগুলো নিদালের এই অপারেশনের নিন্দা প্রকাশ করার জন্য ন্যাক্কারজনক কোরাস করে বেড়াচ্ছে।

প্রকৃতপক্ষে, মার্কিন সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা আজ মুসলিমদের জন্য যে একটি ইসলামী দায়িত্ব- এ ব্যাপারে কোন মতভেদ থাকতে পারে না। এক দানা পরিমাণ জ্ঞান রাখেন এমন কোন আলেম ও এই ব্যাপারে ইসলামের সুস্পষ্ট প্রমাণাদির বিরোধিতা করতে পারবেন না যে, আজকের মুসলিমদের এই অধিকার আছে (অর্থাত্ আমেরিকান সৈন্যদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার অধিকার), বরং মুসলিমদের উপর এটি দায়িত্ব, যে তারা আমেরিকার অত্যাচারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে। নিদাল সে সমস্ত সৈন্যদের হত্যা করেছেন যাদেরকে ইরাক ও আফগানিস্তানে মুসলিমদের হত্যা করার জন্য পাঠানো হচ্ছিল। অতএব, যে সব আমেরিকান মুসলিম তাঁর আচরণে নিন্দা জানিয়েছে, তারা আসলে মুসলিম উম্মাহর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে আর মুনাফেকির মধ্যে পতিত হয়েছে।

আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেনঃ “সেসব মুনাফেককে সুসংবাদ শুনিয়ে দিন যে, তাদের জন্য নির্ধারিত রয়েছে বেদনাদায়ক আযাব। যারা মুসলমানদের বর্জন করে কাফেরদেরকে নিজেদের বন্ধু বানিয়ে নেয় এবং তাদেরই কাছে সম্মান প্রত্যাশা করে, অথচ যাবতীয়সম্মান শুধুমাত্র আল্লাহরই জন্য।” [সূরা নিসাঃআয়াত ১৩৬-১৩৭]

একজন মুসলিম হয়ে, আমেরিকায়বা মোটের উপর বলতে গেলে পশ্চিমার যেকোন দেশে অবস্থান করতেযেয়ে যে দ্বন্দ্ব বাঁধছে, তা আজ সেই ইসলামী অভিমতের হেকমত উন্মোচন করে, যা মুসলিমদের কে পশ্চিম থেকে হিজরতকরার ব্যাপারে আহ্বান জানায়। মুসলিমদের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন এরূপ একটি পরিবেশে ইসলাম মেনে চলা ক্রমেই কঠিন থেকে কঠিনতর হচ্ছে।

আল্লাহ তা’আলা আমাদের ভাই নিদালকে ধৈর্য্য, উদ্যম এবং দৃঢ়তা দান করুন, আর আমরা আল্লাহর কাছে দু’আ করি তিনি যেন উনার এই মহত্ ও বীরত্বপূর্ণ কাজকে কবুল করে নেন। আমীন!

————
শেইখ আনোয়ার আল আওলাকি

৯ নভেম্বর, ২০০৯

শেইখ আনোয়ার আল আওলাকির ব্লগ থেকে সংগৃহীত, এ লেখাটি প্রকাশ করার পরে ব্লগটি সরিয়ে ফেলা হয়।

মুসলিম ভাই বোনেরা অনেক কষ্টে আছে পৃথিবীর প্রতি প্রান্তে

বেদনা মধুর হয়ে যায় তুমি যদি দাও.........


বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম


শিরোনাম দেখে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আমি কোন রোমান্টিক লেখা লিখতে বসিনি। আমি আপনাদের আজ মুসলিমদের এমন কিছু ব্যাথাতুর গল্পের পাণ্ডুলিপি শুনাব যা যুগে যুগে মুসলিমদের চোখে আনন্দাশ্রু ঝরিয়েছে। যে ব্যথায় ব্যথাতুর হয়ে মুসলিমরা আল্লাহ্‌র দ্বীনকে ভালবাসতে শিখেছে। আল্লাহ্‌র জন্য জীবন দিতে শিখেছে। আসুন গল্প শুরু করি......


হযরত হানযালা (রাঃ)। চিনতে পারছেন না তাইতো?? তিনি একজন সাহাবী ছিলেন। ঘটনাটা উহুদ যুদ্ধের আগে। তখন নিয়ম ছিল যুদ্ধের আগের দিন মুজাহিদদের বেস ক্যাম্পে থাকতে হত। কিন্তু যুদ্ধের আগের দিন হযরত হানযালা (রাঃ) এর বিয়ে হয়। আগামীকাল উহুদের যুদ্ধ আর আজ হানযালার বাসর! রাসুল (সাঃ) তাকে বেস ক্যাম্প থেকে ছুটি দেন তার বিয়ে উপলক্ষে। পরদিন সকাল বেলা জিহাদের ডাক আসলে হানযালা তড়িঘড়ি ঘরে আল্লাহ্‌র রাস্তায় জিহাদে বেড়িয়ে পড়েন। কোন সঙ্কোচ নেই, কোন থমকে যাওয়া নেই! নববধূর চোখের পানি ছিল কিনা জানিনা কিংবা থাকলেও সেটা হানযালাকে আটকাতে পারেনি। যে মানুষটা বিয়ে করেছে সে হয়ত বুঝতে পারবে বিয়ের পরের মুহূর্তগুলো একজন মানুষের জীবনে কতো আনন্দের, কতো আকাঙ্ক্ষিত। মনে হবে এই সময়গুলো যেন সারাজীবন ধরে চলতে থাকে......
এধরণের একটা মুহূর্ত থেকে হানযালা উহুদের যুদ্ধে গিয়েছিলেন। এবং সুবাহানাল্লাহ তিনি এত বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেছিলেন যে এক পর্যায়ে তিনি কাফেরদের দলপতি, নিরাপত্তায় বেষ্টিত আবু সুফিয়ানকে হত্যার কাছাকাছি চলে যান। কিন্তু কঠিন নিরাপত্তাবলয় ভাঙতে গিয়ে তিনি শহীদ হন।

আমরা ইসলামপন্থীরা কথায় কথায় মুসলিম উম্মাহ শব্দটা ব্যবহার করি। আমরা সবাই মনে করি আমরা উম্মাহর জন্য চিন্তিত। আমরা উম্মাহ রক্ষার কাজ করছি ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে উম্মাহ বলতে আমরা আসলে কি বুঝি!! উম্মাহ কষ্টে থাকবে, উম্মাহর রক্ত ঝরবে, উম্মাহ উদ্বাস্তু হবে, উম্মাহ আল্লাহ্‌র জমিনে গিনিপিগ হয়ে থাকবে আর আমরা উহ্, আহ্, হায় হায় রব তুলে, ফেসবুকে স্ট্যাটাস ছবি শেয়ার দিয়ে উম্মাহর প্রতি আমাদের দায়িত্ব পরিপূর্ণ করব?? আসলেই এরকম কিনা সেই চিন্তার ভার আপনাদের দিলাম, আমার লেখার উদ্দেশ্য আপনাদের উম্মাহর প্রতি দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তোলা নয়। আমি আল্লাহ্‌র রাস্তায় কষ্টের পাথর বুকে চেপে নিশ্চুপে, নিভৃতে আল্লাহ্‌র কাজ করে যাওয়া আমার মুসলিম ভাই বোনদের কিছু কথা আপনাদের জানাতে চাই।


কিছুদিন আগে আমার এক বন্ধুকে পুলিশ ধরে নিয়ে যায়। অনেক চেষ্টা তদবির করে তার জামিন হয়। কিন্তু জামিন নিয়ে বের হওয়ার সময় জেলগেটে বেচারাকে আবারো আটক করা হয়। সে আমার সরাসরি বন্ধু না। আমার আরেক বন্ধুর মাধ্যমে তার সাথে আমার পরিচয়। সে জেলে থাকার সময় আমার সেই বন্ধু বলতেছিল, জীবনটা কি অদ্ভুত তাইনা?? ক্লাস হচ্ছে, পরীক্ষা হচ্ছে, ল্যাব হচ্ছে, আমরা সেসব নিয়া ব্যস্ত, টেনশন করছি আর আমার বন্ধুর কাছে কি এসবের কোন অর্থ আছে?? ভুল হোক শুদ্ধ হোক সে আল্লাহ্‌র রাস্তাতেই তো কাজ করতে গিয়ে জীবনের কিছু সংজ্ঞা অন্যভাবে ভাবছে। একটাই জীবন অথচ কি বৈপরীত্য আমাদের এক একজনের চিন্তায়। যেদিন আমার খুব কাছের এক ভাই আটক হল এর পরের দিন আমার সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা ছিল। ঐদিন রাতে আমার ঘুম হয়নি। পরদিন পরীক্ষার হলে লেখা শেষ করে কেমন একটা আনমনা হয়ে বসে আছি তখন ম্যাডাম জিজ্ঞেস করল আমি ঠিক আছি কিনা! পরীক্ষার হলে আমার চারপাশের ছেলেমেয়েগুলোকে দেখছিলাম খুব আগ্রহ নিয়ে। এদের সবাইকে আমি চিনি। এরা সবাই ক্যাম্পাসে সারাদিন অনেক হৈ হুল্লোড় করে। চঞ্চলতা, বন্ধু আড্ডা গান লেগেই থাকে এদের প্রতিটা দিনে। কিন্তু পরীক্ষার হলে চিত্রটা কতো ভিন্ন। টেনশনে এক একটা মুখ শুকিয়ে কিম্ভূতকিমাকার দেখাচ্ছে। কারো দুই তিন মার্ক্সের একটা প্রশ্ন হয়তো ছুটে গেছে, কেউ হয়তো একটা উত্তর ভুল লিখেছে, কারো হয়তো পরীক্ষার হলে খাতা দশ মিনিট রেখে দিয়েছে...... টেনশন...... আক্ষেপ...... আফসোস!! এদের কাছে আমার বন্দী ভাইয়ের কোন গুরুত্ব নেই! রিমান্ডে নির্যাতিত দাড়িওয়ালা হুজুরের কথা এরা জানেনা, কারাগারের চারদেয়ালে বন্দী দাঁড়ি মুখের শান্ত চেহারার তরুণ ছেলেগুলোর বুকের সুখ সুখ ব্যথা এরা কোনদিন অনুভব করতে পারবে না। কোনদিন না। আফসোস......

পৃথিবীর প্রতি প্রান্তে প্রান্তে আমার মুসলিম ভাই বোনেরা অনেক কষ্টে আছে ভাই। অনেক কষ্টে। আপনি কি কোনদিন অনুভব করেছেন কতো তীব্র সেই কষ্ট?? একটা প্রশ্ন করি?? উম্মাহর ঐক্য কি?? উম্মাহর ঐক্য মানে এই না যে আমরা সবাই ফটোকপি হব, সবাই এক হব। নিজেদের মধ্যে মতের অমিল রাসুল (সাঃ) সময় থেকেই ছিল এটা সারাজীবন থাকবে। উম্মাহর ঐক্য হল তখন যখন আপনার এক মুসলিম ভাইয়ের কষ্টে আপনি ব্যথিত হবেন। যখন আপনার মুসলিম ভাই বোনের চোখের পানি দেখে মনের অজান্তেই আপনি কেঁদে ফেলবেন। যখন আপনার কোন ভাইয়ের বিপদের কথা মনে করে খেতে বসে আপনার গলায় খাবার আটকে যাবে। যখন আপনি আল্লাহ্‌র কাছে কেঁদে কেঁদে বলবেন, হে আল্লাহ্‌ আমার ভাইকে রক্ষা কর, আমার বোনকে রক্ষা কর। This is the way you feel the ummah my dear brothers. This is the way…….


আমরা প্রতিদিনই শুনি এতজন গ্রেফতার হয়েছে। প্রতিদিনই শুনি গুয়ান্তনামো, আবু গারিবের মত কারাগারে আমাদের ভাই বোনেরা নির্যাতিত হচ্ছে। কিন্তু আমরা কোনদিনও আমার ভাইটির কথা ভাবিনা তার পরিবারের মত করে। তার মা বাবার কতো টেনশন। তার স্ত্রীর কি কান্না। তাদের বাসায় হয়তো রান্নাই হয়নি, ছোট ছোট বাচ্চাগুলো কাঁদতে কাঁদতে হয়তো না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়েছে। মমতাময়ী মা, প্রিয় স্ত্রী, বা, ভাই বোন সবার চোখ নির্ঘুম আর শঙ্কা। বন্দী হওয়া ছেলেটা হয়তো বেঁচে ফিরবে কিংবা শহীদ হয়ে। এরকম অসংখ্য ত্যাগের পাণ্ডুলিপি দিয়ে ইসলামের বিজয়ের গল্প সাজানো হয়েছে। অকাতরে বিলিয়ে দেওয়া জান মালের বিনিময়ে আল্লাহ্‌ কিছু মানুষকে তার প্রিয় বান্দা হিসেবে পছন্দ করেছেন।

আমি মুসলিমদের উপর নির্যাতনের কথা আসলেই ইরাকে আমাদের বোন ফাতেমার কথা বলি। এই বোন তার মুসলিম ভাইদের উদ্দেশ্য করে একটা চিঠি লিখেছিল। আবু গারিব গারাগারে অন্য মুসলিম বোনদের সাথে আমেরিকান কুত্তাদের দ্বারা দিনে নয়বার ধর্ষিত হওয়ার কষ্ট বুকে চেপে এই বোন তার মুসলিম ভাইদের কাছে লেখা চিঠি শুরু করেছে কিভাবে জানেন?? সে শুরু করেছে এভাবে,


"বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইছি। পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।

ক্বুল হু ওয়াল্লাহু আহাদ (বল আল্লাহ এক)
আল্লাহুস সমাদ (আল্লাহ অমুখাপেক্ষী)
লাম ইয়ালিদ (তিনি কাউকে জন্ম দেননি)
ওয়ালাম ইউলাদ (না তাঁকে কেউ জন্ম দিয়েছে)
ওয়ালাম ইয়া কুল্লাহু কুফুওয়ান আহাদ (তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই) - সুরা ইখলাসঃ ১-৪

আমি শুরুতে এই সুরার উদ্ধৃতি দিলাম, কেননা আমি মনে করি মহান আল্লাহর পরিচয় তুলে ধরার জন্য এই সুরাটিই সবচেয়ে ভালো, আর মুমিনদের অন্তরে এই সুরাটি দৃঢ়ভাবে গেঁথে আছে।”


সুবাহানাল্লাহ! আল্লাহু আকবর! চরম কষ্টের মুহূর্তেও এই বোন আল্লাহ্‌র গুণগান গাইতে ভুলেনি। এ কি আপনার আমার মুসলিম বোন নয়? আল্লাহ্‌ এদের মাধ্যমে আমাদের পরীক্ষা করছেন। আল্লাহ্‌ এদের উপর যে অসহ্য যন্ত্রণা দিয়েছেন এতে আস্থা রাখা বোনদের জন্য আল্লাহ্‌র কাছে অফুরন্ত পুরষ্কারের ডালি অপেক্ষা করছে ইনশাআল্লাহ। এই ব্যথা , এই যন্ত্রণা হাজারগুণ আনন্দের উপলক্ষ হয়ে তাদের কাছে ফিরে আসবে ইনশাআল্লাহ। ইরাকে আমার মুসলিম বোনদের ক্রমাগত ধর্ষণের কিছু প্রসেসের গল্প শুনবেন?? আমি মেয়ে নই, আমি ছেলে। তারপরও এই আর্টিকেলটা আমি দুই প্যারার বেশী পড়তে পারিনি। আমার সেই সাহস হয়নি। এরা আমাদের বোন, এরা আমাদের মুসলিম ভাইদের স্ত্রী, কারো মা! পড়ে দেখুন এবং ভাবুন......

http://www.globalresearch.ca/the-dark-and-secret-dungeons-of-iraq-horror-stories-of-female-prisoners/5313974


হযরত বিলাল (রাঃ) আমার খুব প্রিয় একজন সাহাবী। তাঁর উপর মুশরিকদের অত্যাচারের বিবরণ নতুন করে বলার কিছু নেই। ইসলাম গ্রহণ করার পর যে সাতজন প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহনের কথা ঘোষণা করেছিলেন হযরত বিলাল তাদের একজন অথচ তিনি ছিলেন একজন দাস। তাঁর উপর সীমাহীন অত্যাচার করা হবে এটা তিনিও জানতেন, তাকে প্রটেক্ট করার জন্য কেউ নেই সেটাও জানতেন। কিন্তু ঈমানের কি শক্তিমত্তাই না তিনি দেখিয়েছিলেন! মরুভুমির উত্তপ্ত বালিতে বুকে পাথর চাপা দিয়ে শুইয়ে রাখা বিলালের পেছন দিক ঝলসে যাওয়া দেখে এক কাফের ব্যঙ্গ করে বলল, তোমার পেছনদিক সত্যিই খুবই কুৎসিত দেখাচ্ছে! নিশ্চয় এই দিনগুলোই তোমার জীবনের সবচেয়ে কষ্টের দিন। জবাবে বিলাল বললেন, আল্লাহর কসম! এই দিনগুলোতেই আমি ঈমানের মিষ্টতার স্বাদ পেয়েছি!

ইসলামে সীমাহীন অত্যাচার আর ঈমানের পরীক্ষা দিয়েছেন যারা হযরত বিলাল তাদের মধ্যে অন্যতম। তার প্রতিদানও আল্লাহ্‌ তাকে দিয়েছেন। সহিহ ইবন খুযাইমা গ্রন্থে বর্ণিত আছে, একদিন রাসুল (সঃ) বিলালকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেনঃ "বিলাল, কিসের বদৌলতে তুমি আমার আগেই জান্নাতে পৌঁছে গেলে? গতরাতে আমি জান্নাতে প্রবেশ করে তোমার খশখশা আওয়াজ শুনতে পেলাম।”

মুমিনদের কষ্টের সান্ত্বনা দিয়ে আল্লাহ্‌ কুরআনে সূরা ইনশিরাহতে বলেছেন, "নিশ্চয় কষ্টের সাথে স্বস্তি রয়েছে।" [সূরা ইনশিরাহঃ ৫]


মক্কার কাফেরদের সীমাহীন অত্যাচার আর সইতে না পেরে মুসলিমরা মদিনায় হিজরত করেছিল। নিজের ঘর বাড়ী, ধন সম্পত্তি সব ছেড়েছিল। শুধু আল্লাহ্‌র জন্য, শুধু ইসলামের জন্য। সব হারানোর বেদনা এদেরকে কোনদিন আল্লাহ্‌র রাস্তা থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। হযরত সুহাইব ইবন সিনান আর রুমি (রাঃ) এই বেচারা আরবের বাইরে থেকে এসে মক্কায় প্রচুর ধন সম্পদের মালিক হয়েছিলেন। সবাই হিযরত করে মদিনায় চলে গেলেও তিনি যেতে পারলেন না। কুরাইশরা তাকে সবসময় চোখে চোখে রাখতো। উনি যাতে কোনভাবে পালাতে না পারে। একদিন কুরাইশদের চোখ ফাঁকি দিয়ে তিনি বেরিয়ে পড়লেন আর এটা জানতে পেরে কুরাইশরা তার পিছু নিল। তারা বলল মক্কায় যে ধন সম্পদ অর্জন করেছে সেই সম্পদ নিয়ে তারা তাকে যেতে দেবে না। তখন সিনান আর রুমি সহজ ভাবেই বলল, “আমি যদি আমার সব ধন সম্পদ তোমাদের হাতে তুলে দেই তাহলে কি তোমরা আমাকে যেতে দেবে?” তারা উত্তর দিল, হ্যাঁ! সিনান আর রুমি তার সবকিছু তাদের হাতে তুলে দিলেন শুধু এজন্য যে তারা তাকে মক্কা থেকে মদিনায় যেতে দেবে! সুবাহানাল্লাহ! তার এর ত্যাগের জন্য রাসুল (সাঃ) তাকে দেখেই তিনবার বলেছিলেন, “নিশ্চয় ব্যবসা লাভজনক হয়েছে”।


হিযরতের পর মদিনায় মুহাজিরদের চাপে অর্থনৈতিক ভিতটা নড়ে উঠেছিল। চরম আর্থিক দুর্গতি দেখা দেয়। আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে এরকম চরম কষ্টের সময়ও মুসলিমরা জিহাদে অংশগ্রহণ করত। তাদের এই চরম কষ্টের সময়গুলো সম্পর্কে হযরত সা’দ বলেন, “আমরা রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর সাথে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতাম; অথচ তখন গাছের পাতা ছাড়া আমাদের খাওয়ার কিছুই থাকতো না। (তা খেয়েই আমরা জীবন ধারণ করতাম) আর আমাদের বিষ্ঠা হত উট ছাগলের বিষ্ঠার মত”।

কষ্ট, হারানোর বেদনা, বিপদ এসব মুমিনের নিত্যসঙ্গী। আল্লাহ্‌র রাসুল (সঃ) সারাজীবন কষ্ট করেছেন। সাহাবারা সারাজীবন কষ্ট করেছেন। যুগে যুগে আল্লাহ্‌র রাস্তায় মুমিনরা সীমাহীন দুঃখ কষ্টের সম্মুখীন হয়েছেন, এখনো তাই। কুরআনে আল্লাহ্‌ এসব নির্যাতিত, বিপদে পতিত মুমিনদের অবিভাবকত্ব গ্রহণ করেছেন। তিনি বলেছেন,

“যারা ঈমান আনে আল্লাহ তাদের অভিভাবক, তিনি তাদেরকে অন্ধকার থেকে বের করে আলোতে নিয়ে যান”। [সূরা বাকারাঃ ২৫৭]

আল্লাহ্‌ এই মানুষগুলোকে তার প্রিয় বান্দা হিসেবে পছন্দ করেছেন। তাদেরকে কল্যাণ দান করেছেন। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুল (সঃ) বলেছেন, “মহান আল্লাহ্‌ যে ব্যক্তির কল্যাণ চান তাকে বিপদে পতিত করেন”। (বুখারি)

হযরত আবু সাইদ ও আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে রাসুল (সঃ) বলেছেনঃ "মুসলিম বান্দার যেকোনো ক্লান্তি, নিত্য ব্যাধি, দুশ্চিন্তা, উদ্বিগ্নতা, দুঃখ- কষ্ট ও অস্থিরতা হোক না কেন, এমনকি কোন কাঁটা ফুটলেও তার কারণে মহান আল্লাহ্‌ তার গুনাহসমুহ মিটিয়ে দেন”। (বুখারি, মুসলিম)

কাফের, মুশরিক আর ইসলামের শত্রুদের অত্যাচার, জুলুমের মাঝেও মুমিনদের জন্য সুসংবাদ আছে। আল্লাহর পুরষ্কার আছে। হক্ব আর বাতিলের চিরায়ত দ্বন্দ্বে আল্লাহর কাছে কার পরিণতি কি সেটা সূরা বুরুজের দুইটা আয়াত দিয়ে বলে দেওয়া যায়। আল্লাহ্ বলছেন,

"যারা মুমিন পুরুষ ও নারীকে নিপীড়ন করেছে, অতঃপর তওবা করেনি, তাদের জন্যে আছে জাহান্নামের শাস্তি, আর আছে দহন যন্ত্রণা," [সূরা আল বুরুজঃ ১০]
"যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে তাদের জন্যে আছে জান্নাত, যার তলদেশে প্রবাহিত হয় নির্ঝরিণীসমূহ। এটাই মহাসাফল্য।" [সূরা আল বুরুজঃ ১১]


অত্যাচারিত বিলাল, আম্মাররা আল্লাহর মেহমান হয়। এরা মরেও বেঁচে থাকে। যুগ যুগ ধরে এদের উত্তরসূরিরা বেঁচে থাকে। ইমাম মালিক, আহমদ ইবন হাম্বল থেকে ইবন তাইমিয়া, সাইদ কুতুব, আওলাকি কেউই মরেনি। কাফেররা তাদের মারতে পারেনি। শহীদের রক্ত কখনো শুকায়না। মজলুমের আর্তনাদ বহুগুণ বিধ্বংসী হয়ে জালিমের কাছে ফিরে আসে। অবশ্যই ফিরে আসে। একদিন সময় আসবে, আলবৎ আসবে......

দোয়া করবেন সবাই। অনেক অনেক দোয়া। আমার ভাইদের জন্য দোয়া। আমার ভাইদের জন্য ভালোবাসা।

আউফ ইবনে মালিক আশযায়ী (রা) রাসুলুল্লাহ (সা) এর কাছে এসে বললেন,
“হে রাসুলুল্লাহ (সা), কাফিররা আমার ছেলেকে বন্দী করে নিয়ে গিয়েছে আর তাতে আমার স্ত্রী বিচলিত হয়ে আছে, আপনি এ ক্ষেত্রে আমাকে কি উপদেশ দিবেন?”
রাসুলুল্লাহ (সা) বলেন, “তোমার স্ত্রী এবং তোমার জন্য আমার উপদেশ হল তোমরা ঘনঘন – “ লা হাওলা ওয়ালা কুউওয়াআ ইল্লা-বিল্লা-হি” বলতে থাক” .................. "

হাদিসটি ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন।

ইনশাআল্লাহ্ আমরা আমাদের মুসলিম ভাইদের জন্য দোয়া করব বেশী বেশী। মুসলিম উম্মাহর জন্য দোয়া করব, চিন্তা করব এবং অবশ্যই কাজ করব ইনশাআল্লাহ।


শেষকথাঃ কষ্টের মুহূর্তগুলোতে আমার খুব প্রিয় একটা হাদিস আছে। হযরত আবু ইয়াহইয়া সুহাইব ইবন সিনান (রাঃ) থেকে বর্ণিত রাসুল (সঃ) বলেছেন, “মু’মিনের ব্যাপারটা আশ্চর্যজনক। তার সকল কাজই কল্যাণময় তার আনন্দময় কিছু হলে সে আল্লাহ্‌র শোকর আদায় করে, তাতে তার কল্যাণ সাধিত হয়। আবার তার দুঃখজনক কিছু হলে সে আল্লাহ্‌র ওপর ধৈর্যধারণ করে, এটাও তার জন্য কল্যাণকর”। (মুসলিম)

কাফের, তাগুতের অত্যাচারে আমরা হতাশ হই, কষ্ট পাই। তখন আমাদের মনে রাখা উচিত আল্লাহ্‌ আমাদেরকে তার অসংখ্য সৃষ্টির মধ্য থেকে খুবই সৌভাগ্যবান হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। তার জমিনে আমাদেরকে তার দ্বীন কায়েমের জন্য বাছাই করেছেন যে পথে দুঃখ, কষ্ট, হতাশা আমাদের ঘিরে ধরে। আমাদের মনে রাখা উচিত এই বেদনার মুহূর্তগুলো আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে রহমতস্বরূপ। আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে এই রহমত আমাদের আখিরাতকে মধুর সময়ে ভরিয়ে দেবে ইনশাআল্লাহ। আমরা হতাশ হবো না। ধৈর্য হারাবো না। আল্লাহ্‌র উপর আস্থা রাখবো। মুমিনদের প্রতি আল্লাহ্‌র প্রতিশ্রুতি কখনো মিথ্যে হবার নয়। তালেবান প্রধান মোল্লা উমর ২০০১ সালে একটা কথা বলেছিলেন। সেই কথাটাই আমার প্রিয় ভাই বোনদের জন্য সর্বশেষ অনুপ্রেরণা হিসেবে দিয়ে গেলাম.....

“I am considering two promises. One is the promise of Allah, the other of Bush. The promise of Allah is that my land is vast...the promise of Bush is that there is no place on Earth where I can hide that he won't find me. We shall see which promise is fulfilled.”


একদিন আমাদেরও সময় আসবে কাফেরদের টুটি চেপে ধরার। অবশ্যই আসবে ইনশাআল্লাহ। সেদিনের আগপর্যন্ত তোরা ঠিকে থাক। হাল ধরে থাক। ভয়ংকর ঝড় সব এলোমেলো করে দেবে কিন্তু একদিন আমরা তীরে পৌঁছব ইনশাআল্লাহ। আলবৎ পৌঁছব......
by Anika Warda Tuba (Notes) on Monday, 10 June 2013 at 21:01

সোমবার, ১০ জুন, ২০১৩

ইসলামী খিলাফত রাষ্ট্রের পরাশক্তি রোম ও পারস্য বিজয়

ইসলামী খিলাফত রাষ্ট্রের পরাশক্তি রোম ও পারস্য বিজয়



[আমরা মুসলিমরা তো কত ঘটনাই জানি, কিন্তু কয়জনকে জিজ্ঞেস করলে বলতে পারবে তাদেরই জাতির আদি পুরুষদের গৌরবমাখা স্বর্ণ যুগের কাহিনী?!!  কিন্তু আবার আমরা মুসলিমরাই  অনেক কাহিনী জানছি অনেক ঘটনা পড়ছি  যেগুলোর বেশির ভাগই কল্প কাহিনী বা সায়েন্স ফিকশন। আসুন তবে কিছু বাস্তব কাহিনী জানি, যেগুলো ইতিহাস চিরকাল স্মরণ করতে বাধ্য।]

                                                               বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

৬২২খ্রিষ্টাব্দে  রসুল (সাঃ) মদিনাতে  হিজরত করার পর সেখানে ইসলামিক রাষ্ট্র  প্রতিষ্ঠা করেন যার পরিচালনা হতো এমন এক আদর্শদিয়ে যেটা মহান আল্লাহর নিকট একমাত্র জীবনব্যবস্থা। রাসুল (সাঃ) –এর সময়থেকেই সেই আদর্শের ধারক ও বাহকগন দাওয়াত ও জিহাদের মাধ্যমে সেই মানবতার আদর্শকেপৌঁছে দেয়া শুরু করেন মদিনার বাইরে নতুন নতুন অঞ্চলে, যেসব অঞ্চলের শাসকগণ সেইঅঞ্চলের সাধারণ জনগনের উপর খোদা হয়ে বসে ছিল, প্রতিষ্ঠা করত সেথায় সীমাবদ্ধ জ্ঞানেআবদ্ধ মানব তৈরি শাসন, অত্যাচারে অত্যাচারে নিষ্পেষিত করত নাগরিকদের জীবন, বঞ্চিতকরত তাদের প্রাপ্য ন্যায্য অধিকার। হয়ত কোন কোন শাসক রাসুল (সাঃ) ও তার উত্তরসূরিখিলাফতের শাসকদের  দাওয়াত গ্রহন করেসানন্দে ইসলামক গ্রহন করত, নয়ত কেউ কেউ শান্তির আদর্শ ইসলাম গ্রহন না করে  জিযয়া কর দেয়ার মাধ্যমে অন্য রাষ্ট্র থেকেনিরাপত্তার সন্ধি করত, নয়ত বা কেউ কেউ দুটোই অস্বীকার করে যুদ্ধে লিপ্ত হতো।  এভাবেই আল্লাহ তায়ালা মানবতার আদর্শের ধারক ওবাহকদের সুযোগ করে দিতেন  একের পর একরাষ্ট্রে ইসলামকে পৌঁছে দিতে। ফলশ্রুতিতে মুসলিমরা একের পর এক ক্ষমতাধর রাষ্ট্রবিজয়ের মাধ্যমে খিলাফত রাষ্ট্রকে নিয়ে যায় দূর বহু দূর।  


ইসলামী রাষ্ট্রের গোড়াপত্তনের আগে থেকেই পৃথিবীর পরাশক্তি হিসেবে রোম সাম্রাজ্য (বাইজেণ্টাইন) ও পারস্য সাম্রাজ্য (বর্তমান ইরান) নিজেদেরকে আত্মপ্রকাশ করে। রোমেরসীমানা ছিল সিরিয়া  থেকে পশ্চিমে  স্পেন পর্যন্ত, আর পারস্যের সীমানা ছিল ইরাকথেকে পূর্বে খোরাসান (আফগানিস্তান) পর্যন্ত। রোম আর পারস্য উভয়েই যুগের পর যুগ ধরে পরস্পর যুদ্ধে লিপ্ত থাকত।   রাসুল (সাঃ) -এর সময় থকেই  রোমের সাথে সদ্য প্রতিষ্ঠিত  ইসলামিক রাষ্ট্রের যুদ্ধ শুরু হয়। একবার রাসুল (সাঃ) হারেস ইবনে ওমায়র আযদী (রাঃ) কে এক চিঠি দিয়ে বসরার গভর্নরের কাছে দূতহিসেবে পাঠালে রোমের কায়সারের নিযুক্ত 'বালাকা' এলাকার গভর্নর শোরাহবিল ইবনে আমরগাসসানি সেই দূতকে হত্যা করে। তখন দূতকে হত্যা করা যুদ্ধ ঘোষণার শামিল ছিল তাইরাসুল (সাঃ) ৩০০০ মুজাহিদ সেনাবাহিনী নিয়ে রোমানদের ২ লক্ষ সেনাবাহিনীর উপর হামলা করেন, এটিই মুতারযুদ্ধ হিসেবে প্রসিদ্ধ। খালিদ বিন ওয়ালিদ (রাঃ) -এর বুদ্ধিমত্তায় সে জিহাদেমুসলিমরা জয় লাভ করে। পরে মুতার যুদ্ধ ও তাবুকের অভিযানের পরে রাসুল (সাঃ) সবশেষেওসামা (রাঃ) কে সেনাপতি নিযুক্ত করে  সর্বশেষ বাহিনী প্রেরন করেন রোমদের বিরুদ্ধে।  আবু বকর (রাঃ) -এর খিলাফত কালে  তিনি সে বাহিনীর নেতৃত্ব অপরিবর্তনীয় রেখেইসামনে অগ্রসর হতে বলেন।  রাসুল (সাঃ) –এরওফাতের পরে যখন ইরাকে বিভিন্ন গোত্র বিদ্রোহ করে বসে, তখন আবু বকর (রাঃ) হযরতমুছান্না (রাঃ) কে দিয়ে সুকৌশলে সেই বিদ্রোহ দূর করে ইরাকেই মুসলিমদের এক বিশালবাহিনী গড়ে তোলেন, যারা ইরাকের মুসলিমদের বিদ্রোহ থেকে শান্তির পথে একীভূত করেইরানের দিকে ধাবিত হন।

পারস্যের কাহিনিঃ

খলীফা আবু বকর (রাঃ) মদিনা থেকেখালিদ বিন ওয়ালিদ (রাঃ) –এর সেনাপতিত্তে ১০ হাজার মুজাহিদদের এক সেনা বাহিনী মুছান্নার (রাঃ) সাহায্যে ইরাকে পাঠান।সে বাহিনীতে কা’কা বিন আমর তমিমীকে (রাঃ) পাঠানো হয়, যার ব্যাপারে খলীফা বলেন, কা’কাযে বাহিনীতে থাকবে তারা কখনো পরাজিত হবে না’। মাত্র ১৮ হাজার মুজাহিদ নিয়ে ইরাকেরসীমান্তে পারস্য বাহিনীর সেনাপতি হরমুজের বিশাল বাহিনীর সাথে জিহাদে লিপ্ত হয়মুসলিম বাহিনী। হরমুজের বাহিনীতে মুসলিমদের ২.৫ গুন সৈন্য ছিল, আরও ২০,০০০ সৈন্যপথে আসছিল সেই বাহিনীর সাহায্যার্থে। মুসলিমরা পারস্যদের  ধরাসয়ি করতে শুরু করলে প্রচণ্ড যুদ্ধের পরপালিয়ে যায় পারস্যরা, হরমুজ নিহত হয় এ যুদ্ধে। মুছান্না (রাঃ) পরাজিত সৈন্যদেরধাওয়া করে তাদের সাহায্যার্থে আগত কারেনের সৈন্যবাহিনীকে মাযারের নিকট আক্রমন করেনতারাও পরাজিত হয়ে পালিয়ে যায়। খালিদ (রাঃ) সেসব এলাকার পরাজিত বন্দী  নাগরিকদের ছেড়ে দেন, কারণ সেনাপতি  হরমুজ সেইসব গরীব কৃষকদের জোরপূর্বক যুদ্ধেএনেছিল। পরে সেই কৃষকরা একে একে ইসলাম গ্রহন করে তাদের এলাকায় থাকতে শুরু করে।

হীরা বিজয়ঃ  ফোরাতের তীরে বিশাল বন্দর ইমপেশিয়াবন্দর দখল করলেন খালিদ (রাঃ), কিছু ফৌজ নিয়ে সন্ধির বিনিময়ে হীরা বিজয় করলেন,  হীরার গভর্নর আজাদবাহ পালিয়ে গেল। ইরাকেরখৃস্টান কবিলাগুলোর কেন্দ্র ছিল হীরা। হীরাবাসি মনে করেছিল সাধারণত বিজয়ী সৈন্য যেমন পরাজিতের এলাকায় এসে সন্ধিভেঙ্গে তাদের উপর অত্যাচার করে, মুসলিমরা হয়ত তেমনি করবে। কিন্তু তারা মুসলিমদেরকাছে ভিন্ন আচরন দেখে অভিভূত হয়ে গেল, মুসলিমদের কাছে আনুগত্য স্বীকার করল।  হীরার পর খালিদ (রাঃ) আম্মারায় জমায়েত হওয়াইরানী ফৌজের মোকাবেলা করলেন, পরে আইনুত্তামরে আক্রমণ করলেন। আইনুত্তামরের সেনাপতিছিল মেহরান, ইরানীরা এবারো পরাজিত হল। দুমাতুল জন্দল জিহাদঃ  খলীফা আবু বকর (রাঃ)খালিদ (রাঃ) কে ইরাকে পাঠানোর পরেই আয়াজ বিন গনমকে দুমাতুল জন্দলে পাঠান। রাসুল (সাঃ) তাবুকের যুদ্ধে খালিদ (রাঃ) কে দুমাতুল জন্দলে রোমানদের উপর হামলা করতে বলেছিলেন।সেসময় খালিদ (রাঃ)  মাত্র ৫শত জানবাজনিয়ে  সেখানকার খৃস্টান শাসক ওকিদর বিনআব্দুল মালিককে গ্রেপ্তার করে মদিনায় পাঠায়, সে মদিনায় এসে ইসলামকবুল করলে রাসুল (সাঃ) তাকে পুনরায় তার এলাকার শাসনভার দিয়ে দেন। কিন্তু রাসুলের (সাঃ) ইন্তিকালের পর সে আবার বিদ্রোহ করে বসে। তাই খালিদ (রাঃ) আয়াজ বিন গনমকেসাহায্যের জন্য আইনুত্তামর থেকে ৩০০ মাইল দূরে দুমাতুল জান্দালে আক্রমণ করেন। সেখান থেকে  ইরানে যুদ্ধরত মুসলিম বাহিনীর উপর এবং মদিনাতেওহামলার সম্ভাবনা ছিল। আবার উত্তরে আলজারিয়ার খৃস্টানদের   থেকেও হামলার সম্ভাবনা ছিল, যা খালিদ (রাঃ) দুমাতুল জন্দল জয় করে মিটিয়ে দেন।

ফেরাজে রোম ও পারস্যের সম্মিলিত বাহিনীর সাথে জিহাদঃ  খালিদ (রাঃ) দুমাতুল জন্দল থেকে আবার আওইনুত্তামরে ফিরে এসে ফোরাতের তীরধরে 'ফেরাজে' পৌঁছেন। ফেরাজের পশ্চিমে রোম ও পূর্বে পারস্য, ফেরাজ এই দু দেশের সীমানারন্যায় ছিল।  সেখানে খালিদ (রাঃ) এর অবস্থানের খবর পেয়ে রোম আর পারস্য প্রথম বারেরমত একত্রে মুসলিমদের উপর হামলার সিদ্ধান্ত নেয়। কিছুদিন পূর্বে রোমানদের কাছে পারস্য হারার কারনে রোমানদের মুল সেনাপতিত্তেতারা মুসলিমদের হামলা করে। কিন্তু মুসলিমদের তিব্র হামলার মুখে টিকতে না পেরেইরানীরা  রোমদের অনুমতির অপেক্ষা না করেইপূর্ব দিকে পালিয়ে যায়। তাদের দেখে রোমরাও পশ্চিম দিকে পালায়। তাদের লাশের স্তূপপরে থাকে  ফেরাজের ময়দানে। এতে সাথে সাথেইরোম-পারস্যের  ঐক্যের ভিত্তি শেষ হয়ে গেলযেটা ভবিষ্যতে  হুমকি হয়ে দাড়াতে পারতো। এযুদ্ধে পরাজিত হয়ে রোম ও ইরান একে ওপরকে দোষারোপ করতে থাকে।

এদিকে সিরিয়ায়   রোমদের  সাথে নিয়মিত যুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ায় খলীফা আবুবকর (রাঃ) খালিদ (রাঃ) কে ইরানের জিহাদ থেকে সিরিয়াতে যাওয়ার আদেশ দেন। তাই তিনিইরাকে মুছান্না (রাঃ) কে সেনাপতি রেখে ৯ হাজার অভিজ্ঞ মুজাহিদ ও সিপাহ সালার নিয়েসিরিয়াতে চলে যান। এদিকে পারস্যের রাজা ও তার পুত্র উভয়ই মৃত্যুবরণ করলেতারা পারস্য শাহানশাহহিসেবে শাহরিয়ারকে খমতায়বসায়। শাহরিয়ার ভেবেছিলমুছান্না (রাঃ) খালিদ (রাঃ) চলে যাওয়ায় তাদের বিশাল সেনাবাহিনীর আগমন দেখে পালাবে,তাই সে জেনারেল হরমুজকে ১০ হাজার সৈন্য সহ এক বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে মুছান্না  (রাঃ) কে  হামলা করতে  ব্যাবিলন পাঠায়। কিন্তু কিছুদিনপরেই সে শুনেন হরমুজ পরাজিত হয়ে ফিরছে, পাছে   ব্যাবিলন  ময়দানে হাজার হাজার ইরানী সৈন্যের লাশ পরে আছে।


সেকালে রোমের মানচিত্র:-

রোমের কাহিনিঃ

এদিকে খালিদ (রাঃ) কে মদিনা থেকে ইরাকের দিকে অভিযানে প্রেরণের পরই খলীফা আবুবকর (রাঃ)  সেনাপতিদের পতাকা বেধে দিয়েদায়িত্ব প্রাপ্ত  নিজ নিজ এলাকার দিকেপ্রেরন করেন। তিনি  খালিদ ইবনে  সাইদ (রাঃ) কে তায়মার দিকে (এখানে ওমর (রাঃ)খালিদ ইবনে সাইদকে সিরিয়াতে পাঠাতে খলীফাকে নিষেধ করেন, কারণ সে রেশমের জুব্বাপরার ব্যাপারে ওমর (রাঃ) এর সাথে তর্ক করেছিল), ইয়াজিদ ইবনে আবু সুফিয়ান (রাঃ) কে দামেশকের দিকে,  আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ (রাঃ) কে হিমসের  (হোমস) দিকে এবং আমরইবনুল আস  (রাঃ) কে ফিলিস্তিনের দিকেদায়িত্ব দিয়ে পাঠান।   পথে বালাকা অঞ্চলে আবু উবায়দা (রাঃ) সে এলাকারজনগনের সাথে জিহাদে সেটা সন্ধির মাধ্যমে জয় করেন, এটাই সিরিয়ার প্রথম  সন্ধি চুক্তি।

খালিদ ইবনে সাইদ  তায়মা  পৌছলে সেখানে রোমানরা বিশাল সৈন্য দিয়ে তাকেহামলা করে পরে পরাজিত হয়, রোমাণদের অনেকেই সেখানে ইসলাম গ্রহন করে। খালিদ ইবনে সাইদ (রাঃ) পরে 'ঈলিয়া' যান সেখানে মাহানের বাহিনীরকে পরাজিত করেন, মাহান দামেশকে পালিয়েযায়। খালিদ ইবনে সাঈদ 'দামেস্কের'  দিকে মাহানকে আক্রমণ করতে গেলে রোমানরা খালিদ ইবনেসাইদ এর উপর বিজয় লাভ করে খালিদ ইবনে সাইদ পালিয়ে যায়, সে মদিনায় খলীফার কাছেপৌছলে খলীফা বলেন, ‘ওমরই (রাঃ)  তারব্যাপারে অধিক জ্ঞাত ছিল’।

ইয়ারমুকের জিহাদঃ  মুসলিম মুজাহিদরা যখন  সিরিয়ার দিকে আগমন করেন তখন  রোমান সম্রাট হিরাক্লিয়াস ভয় পেয়ে যায়, সে জানত রাসুল (সাঃ) শেষ নবী আর তাদের খৃস্টান ধর্মের সময় শেষ হয়ে গেছে। হিরাক্লিয়াস তখন হিমসে (হোমস) অবস্থান করছিল।   আবু   বকর (রাঃ) এর মোট সৈন্য সংখ্যা ছিল ২১ হাজার ও তাদের সাহায্যার্থে ছিল ইকরিমা ইবনে আবু জেহেল এর ৬ হাজার সৈন্য। হিরাক্লিয়াসের সম্মুখ বাহিনীর দায়িত্বে ছিল জুরজা যিনি পরে ইসলাম গ্রহনের পরই ইয়ারমুকের জিহাদে শহীদ হন (তার খালিদ (রাঃ) এর সাথে এই প্রসিদ্ধ ঘটনা  আমি আমার আরেক নোটে বর্ণনা করেছি)।হিরাক্লিয়াসের ২ লাখ সৈন্যের বিরুদ্ধে মুজাহিদদের  সংখ্যা কম হয়ায় তারা খলীফার কাছে সাহায্য চাইলে খলীফা  খালিদ বিন ওয়ালিদ (রাঃ) কে ইরাক থেকে সিরিয়া যেতে নির্দেশ দেন। তিনি ৫ দিন পরতার ৯ হাজার মুজাহিদ নিয়ে ইয়ারমুকের জিহাদে মুল সেনাপতির দায়িত্বে এসে নিযুক্ত হন।খালিদ (রাঃ) সেখানে যেয়ে দেখেন মুজাহিদগণ রোমানদের সাথে জিহাদে লিপ্ত, অতপর খালিদ (রাঃ) এর আগমনের সংবাদ শুনে রোমানরা মুসলিমদের সাথে সন্ধি করতে চায়। সিরিয়াই ছিলমুজাহিদদের প্রথম বিজিত এলাকা।

বর্ণিত আছে যে, যখন ইয়ারমুকের যুদ্ধে দুই বাহিনী প্রচণ্ড লড়াই করছিল, তখনআরব থেকে এক পত্র বাহক এসে খালিদ বিন ওয়ালিদের (রাঃ) কাছে খলীফার একটি চিঠি দেন।পত্র বাহক খালিদ (রাঃ) কে একান্তে নিয়ে গিয়ে বলেন, খলীফা আবু বকর ইন্তেকাল করেছেন,ওমর (রাঃ) পরবর্তী খলীফা নিযুক্ত হয়েছেন। ওমর (রাঃ) আপনার স্থলে মুল সেনাপতিরদায়িত্বে আবু উবায়দা আমির ইবনে জাররাহ (রাঃ) কে নিযুক্ত করেছেন। খালিদ (রাঃ) এই সংবাদ যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত গোপনরাখেন, যেন এতে মুজাহিদদের মনবল ভেঙ্গে না যায়।

আজনাদায়নের জিহাদঃ “মা’ওয়ারের আরবা”  অঞ্চলে আমর ইবনে আস (রাঃ) এর সাথে রোমানরা যুদ্ধে লিপ্ত ছিল, সেখানে তার সাহায্যার্থে খালিদ (রাঃ), আবু উবায়দা (রাঃ), শুরাহবিল (রাঃ) ও মুরছাদ (রাঃ) মুজাহিদদের নিয়ে এলেই আজনাদায়নের জিহাদ শুরু হয়। এযুদ্ধে রোমানরা ছিল ২ লক্ষ ৪০ হাজার। আর মুসলিম মুজাহিদরা ছিলেন মাত্র ৪০ হাজার।অবশেষে মুসলিম মুজাহিদরাই কাফিরদের পরাজিত করেন। সেনাপতি কায়কালান নিহত হয়।

পারস্যের কাহিনিঃ 


 রাজা-রানীর ঝামেলার কারনে পারস্য থেকে চাপ অনেকটাই কম ছিল মুছান্না (রাঃ) এর উপর। তিনি একদিন নিজেই খলীফা আবু বকরের (রাঃ) কাছে সাহায্যের জন্য গেলেন। সেখানে যেয়ে তিনি আবু বকর (রাঃ) কে মৃত্যু মুখে দেখলেন। আবু বকর (রাঃ) তখনি ওমর (রাঃ) কে পারস্যের দিকে সৈন্য প্রেরণ করতে বলেন এবং সেদিনই (সোমবার) তিনি মুছান্না (রাঃ) ও অন্যান্য সাহাবাদের সাথে শেষ সাক্ষাৎ করে ইন্তিকাল করেন।

আবু বকর (রাঃ) এর ইন্তিকালের পর ওমর (রাঃ) ও মুছান্না (রাঃ) মদিনাতে ইরাকের ব্যাপারে বক্তৃতা দিয়ে মুজাহিদদের সংগ্রহ করতে থাকেন, প্রথমে কেউ রাজি না হলেও পরে আবু উবায়দ ইবনে মাসউদ ছাকাফির (র) রাজি হলে একে একে অনেকেই রাজি হয়। আবু উবায়দা  প্রথম রাজি হয়ায় তাকে সেনাপতি বানিয়ে ওমর (রাঃ) ৭ হাজার মুজাহিদকে ইরাকে পাঠায়। এদিকে খালিদ (রাঃ) এর সাথে যে বাহিনী ইরাক থেকে সিরিয়া  এসেছিল তাদেরকেও ওমর (রাঃ) আবার ইরাক পাঠাতে বলেন।
নামারিকের জিহাদঃ  নামারিক হোল হীরাও কাদেসিয়ার মধ্যবর্তী স্থান। রুস্তম বাহমান কে সেনাপতি করে আবু উবায়দ  কে হামলা করার জন্য নামারিক পাঠায়। তারা পরাজিত হয় ও মাদায়েন (পারস্যের সেকালের রাজধানী) পালিয়ে যায়।
সেতুর জিহাদঃ  পারসিকরা  হাতী সহ এক বিশাল বাহিনী নিয়ে ফোরাতের পারে জমা হয়। মুসলিমরা ছিল মাত্র ১০ হাজার। তারা মুসলিমদের বলে তোমরা নদী পার হয়ে আসবে না আমরা যাব? অভিজ্ঞ মুসলিম সালাররা বলছিলেন তাদের পার হয়ে আসতে, কিন্তু আবু উবায়দ বললেন, “আমরা মৃত্যুর ব্যাপারে যতটা নির্ভীক ওরা ততটা নির্ভীক নয়”,  এই বলে তিনি নদী পার হয়ে গেলেন। কিন্তু অধিকাংশ মুসলিম পাড় না হতেই পারসিকরা  তীর নিক্ষেপকরে, এবং মুসলিমদের ওপাড়ে দাঁড়ানোর জন্য সংকীর্ণ জায়গা দেয়, যেটা যুদ্ধের নিয়মের পরিপন্থী। তারা হাতীগুলো ছেড়ে দিলে মুজাহিদদের ঘোরাগুলো ভয়ে পালাতে থাকে, এতে তারা অনেক মুজাহিদদের তীর মেরে শহীদ করে। আবু উবায়দ ও কয়েকজন   কয়েকটা হাতী মেরে ফেলে, একটা হাতী সেনাপতি আবু উবায়দকে পায়ে পিসে শহীদ করে দেয়, এভাবে পর পর ৭ জন সেনাপতি শহীদ হলে মুছান্না (রাঃ) সেতুর মুখে দাড়িয়ে সকল মুজাহিদদের ধীরে সুস্থে  নদী পার হয়ে চলে যেতে বলেন। এর আগেই ৪ হাজার মুজাহিদ সেতু ভেঙ্গে ফোরাত নদীতে পরে শহীদ হন। অবশেষে বাকিরা পাড় হয়ে জীবন রক্ষাকরে। এযুদ্ধে পারসিকরা জয় লাভ করে, তবুও মুজাহিদরা ৬ হাজার পারসিক ও অনেক হাতীকে হত্যা করে।

এযুদ্ধের পর পারসিকদের রাজা-রানি সমস্যা আবার দেখা দেয়, তারা রুস্তম কেপদচ্যুত করে, পরে আবার ক্ষমতা দিয়ে ফিরুজানের সাথে ক্ষমতা দু ভাগ করে বসায়। এতেতারা দু ভাগে বিভক্ত হয়ে পরে।

বুওয়ায়ব –এর জিহাদ --পারসিকদেরউপর মুসলিমদের প্রতিশোধঃ  বওয়ায়ব হচ্ছে  কুফার নিকটবর্তী স্থান। পারসিকরা সলিমদের আগের মত বলে, তোমরা এপারে এসবে না আমরাওপাড়ে যাব, সেনাপতি মুছান্না (রাঃ) তাদের আসতে বলেন এবং  তাদের জন অনেক জায়গা ছেড়েদেন, যদিও তারা সেতুর যুদ্ধে কম জায়গা ছেড়েছিল ও সব মুসলিম পার না হতেই আক্রমণকরেছিল, কিন্তু মুছান্না তারা আসার ও সারি বদ্ধ ভাবে দাঁড়ানোর অনেক পরে আক্রমনেরসিদ্ধান্ত নেন। পারসিকরাই পরে মুসলিমদের আগে আক্রমণ করে, প্রচণ্ড যুদ্ধের পর তাদেরসেনাপতি মেহরান মারা যায় ও তারা পরাজিত হয়। এযুদ্ধে ১ লক্ষ পারসিক সৈন্য নিহত হয়।


রোমের কাহিনিঃ

দামেশক বিজয়ঃ
 আবু  উবায়দা (রাঃ) ‘ইয়ারমুক’ থেকে ‘মারজ সাকর‘ এ আসলেন, সম্রাট হিরাক্লিয়াস ছিল হিমস-এ (হোমস)। রোমানরা ফিলিস্তিনের সিংহল –এ ৮০হাজার সৈন্য নিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তাই খলীফা ওমর (রাঃ) আবু উবায়দা (রাঃ) কে বললেন হিমসের দিকে এক দল ও ফিলিস্তিনের পথে ফিহল –এর দিকে একদল মুজাহিদ  পাঠাতে যেন তারা হিরাক্লিয়াস ও ফিলিস্তিনের সৈন্যদের বাধা দিতে পারে। পরে আবু উবায়দা (রাঃ) দামেশক অবরোধ করলেন।  একদিন দামেশকবাসী ফুর্তিতে মত্ত থাকলে খালিদ (রাঃ) কা’কা (রাঃ) ও অন্যান্য মুজাহিদদেরনিয়ে দামেশকের উপর ঝাপিয়ে পরলেন ও দামেশকের কিছু অংশ যুদ্ধ ও কিছু সন্ধি করে জয় করলেন।ফিহল –এর জিহাদঃ  দামেশক বিজয়ের পর শুরাহবীল ইবনে হাসানা (রাঃ) এর সেনাপতিত্বে মুজাহিদগন ফিহল-এর দিকে যাত্রা করেন। এ যুদ্ধে ৮০ হাজার রোমান মারা যায়। আবু উবায়দ (রাঃ) শুরাহবীল (রাঃ) কে জর্ডানের শাসক বানিয়েখালিদ (রাঃ) ও অন্যান্যদের নিয়ে হিমস-এর দিকে যাত্রা করেন। পরে শুরাহবীল (রাঃ)জর্ডান থেকে গিয়ে 'বীসান' জয় করেন।
পারস্যের কাহিনীঃ

এদিকে খলীফা ওমর (রাঃ) নিজেই ইরাক যুদ্ধে যেতে চাইলে সাহাবাগন তাকে নিষেধকরেন এবং সা’দ (রাঃ) সেনাপতি নিযুক্ত করে ইরাক পাঠাতে বলেন।  ফলে ওমর (রাঃ) সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রাঃ)-এর সেনাপতিত্বে মুজাহিদেরএক বাহিনী ইরাকে পাঠান, সা’দ (রাঃ) এসে পৌছার আগেই মুছান্না (রাঃ) ইন্তিকাল করেন।
কাদেসিয়ার জিহাদঃ  সেনাপতি সা’দ (রাঃ) কাদেসিয়ায় পৌঁছালে পারসিকরা তাদের মহাবীর সাবেক রাজা রুস্তম কে মুসলিমদের মুকাবিলার জন্য মুল ৮০ হাজারমতান্তরে ১ লক্ষ ২০ হাজার সৈন্য ও আরও ৮০ হাজার সৈন্য  সাহায্যার্থে পাঠায়। তাদের সাথে ৩৩ টি জঙ্গি হাতী ছিল।  এ যুদ্ধে  রুস্তম নিহত হয়ও পারসিকদের বাকি সৈন্য রাজধানী মাদায়েন পালায়।
রোমের কাহিনীঃ 

হিমস জিহাদঃ
আবু উবায়দা (রাঃ) রোমান সৈন্যদের তারা করে হিমসে নিয়ে যান। সেখানেহিরাক্লিয়াস অবস্থান করছিল। পরে খালিদ (রাঃ) তার সৈন্য নিয়ে সেখানে পৌছলে অবরোধদৃঢ় হয়, হিমসবাসী সন্ধি করে। হিমস জয় হয়।

কিন্নাসরীনের জিহাদঃ  হিমস জয়ের পর আবুউবায়দা (রাঃ) খালিদ (রাঃ) কে কিন্নাসরীনে পাঠান, খালিদ (রাঃ) সেখানে যেয়ে সব রোমানসৈন্যদের হত্যা করে। পরে গ্রামবাসী সন্ধি করে। কিন্নাসরীন জয় হয়। 
এবছরই হিরাক্লিয়াস সিরিয়া ছেড়ে কন্সটাণ্টিনোপল চলে যায়।কায়সারিয়্যার জিহাদঃ  খলীফা ওমর(রাঃ) মুয়াবিয়া ইবনে আবী সুফিয়ান (রাঃ) কে সেনাপতি নিযুক্ত করে তাকে কায়সারিয়্যা আক্রমণ করতে বলেন। মুয়াবিয়া (রাঃ) সেখানে পৌছলে রোমানরা যুদ্ধ শুরু করে, প্রচণ্ডযুদ্ধের পর তাদের ৮০ হাজার সৈন্য নিহত হয় এবং ১ লাখ পলায়ন করে। মুসলিমরা জয়লাভকরেন।

 রোমান সেনাপতি আরতাবুন বায়তুল মুকাদ্দাস (জেরুজালেম) ও রামাল্লার কাছে বিশাল বিশাল দুটি সেনাবাহিনী প্রস্তুত করে রেখেছিল। তাই আমর ইবনুল আস (রাঃ)  বায়তুল মুকাদ্দাস জয় করতে চাইলে বায়তুল মুকাদ্দাসের বাসিন্দারা তাকে ওমর (রাঃ) কে এসে সন্ধি করে জয় করতে বলে।

হযরত ওমর (রাঃ) এর হাতে বায়তুল মুকাদ্দাস বিজয়ঃ  সন্ধির মাধ্যমে বায়তুল মুকাদ্দাস জয় করে ওমর (রাঃ) ‘সাখরা’  নামক এক পাথরের উপর থেকে ময়লা আবর্জনা সরান। এটি ইহুদীদের একটি পবিত্র পাথর যেটিকে কিবলা বানিয়ে তারা ইবাদাত করত, পরে রোমান  খৃস্টানরা বায়তুল মুকাদ্দাস জয় করে এটির উপর সবচেয়ে নোংরা আবর্জনা ফেলত। রাসুল (সাঃ) একদিন রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াসকে  চিঠির মাধ্যমে সে পাথর থেকে আবর্জনা সরাতে বললে হিরাক্লিয়াস সেখান থেকে ময়লা সরানো শুরু করে, ১/৩ অংশ সরানোর পরেই ওমর (রাঃ) বায়তুল মুকাদ্দাস জয় করেন। রোমানরা রাসুল (সাঃ) এর ৩০০ বছর আগে বায়তুল মুকাদ্দাস জয় করে। ইহুদীরা বায়তুল মুকাদ্দাসে খৃস্টানদের ‘আল কামামা’ নামক স্থানকে ডাস্টবিন বানিয়ে ছিল। ‘আল কামামা’ হল এমন একস্থান যেখানে ইহুদীরা ইসা (আঃ) ভেবে এক লোককে ক্রুশ বিদ্ধ করে হত্যা করার পর সেখানে কবর দেয়। তাই খৃস্টানরাও এর প্রতিশোধসরূপ ‘সাখরা’ পাথরে ময়লা ফেলে সেটাকে ডাস্টবিন বানায়। 

পারস্যের কাহিনিঃ
 

ব্যাবিলনের জিহাদঃ   কাদেসিয়ার পরাজয়ের পর লক্ষাধিক সৈন্য ব্যাবিলনেআশ্রয় নেয়। এঘটনা সা’দ (রাঃ) জানার পরে ব্যাবিলনে আক্রমণ করেন। পারসিকরা ব্যাবিলনছেড়ে মাদায়েন ও নিহাওয়ান্দের দিকে পালিয়ে যায়।

নাহারশীরের জিহাদঃ  সা’দ (রাঃ) সালমান ফারসী (রাঃ) কে   নাহারশীরের জন্য সেনাপতি করে পাঠায়। সেখানে পারসিকরা এক সিংহকে মুসলিমদের চলাচলের রাস্তায় বেধে রাখে, সা’দ (রাঃ) এর ভাতিজা হাশেম সেটিকে হত্যা করে। অবশেষে, প্রচণ্ড অবরোধের পর মুসলিমরা এযুদ্ধে জয় লাভ করেন।
  মাদায়েন বিজয়ঃ   সা’দ (রাঃ) সেনাবাহিনী নিয়ে মাদায়েন যাত্রা করেন। তারা দজলা নদীর তীরে যেয়ে দেখেন সেখানে কোন নৌকা নেই, সব নৌকা পারসিকরা অপর পারে নিয়ে গেছে, সেতুও ভেঙ্গে ফেলেছে। তাই সা’দ (রাঃ) মুজাহিদদের নিয়ে ঘোড়া সহই  পানিতে নেমেপরেন, নদীর পানি কূলে কূলে ভরা  ছিল। এদেখে অপর পাড়ে দাঁড়ানো পারসিক সেনারা পাগল-পাগল, জীন-ভুত বলে ভয়ে পালিয়ে যায়। সেখানে পারস্যের রাজা-বাদশারপ্রচুর ধন সম্পদ পড়েছিল, কিছুই তারা নিতে পারেনি। ৩  কোটি স্বর্ণ মুদ্রা ফেলে রেখে ইয়াযদগিরদ 'হুলওয়ানে' পালিয়ে যায়। এ যুদ্ধে  ‘ফাই’  সম্পদ অনেক বেশি ছিল।

জলুলার জিহাদঃ
 ইয়াযদগিরদ 'জলুলা'তে মাহরানের নেতৃত্বে বিশাল বাহিনী রেখে হুলওয়ান পালায়। জলুলাতে সা’দ (রাঃ) এর সাথেতাদের যুদ্ধ হয়। প্রচণ্ড যুদ্ধের পর মাহরান পালায়, পারসিকদের ১ লক্ষ সৈন্য নিহতহয়। পরে কা’কা (রাঃ) তারা করে মাহরানকে হত্যা করেন।
 পরে মুসলিমরা  হুলওয়ানের  তিকরীত ও মুসেল এবং মাসিবযান বিজয় করেন।

রোমের কাহিনিঃ

কিরকিসিয়্যাহ ও হীত বিজয়ঃ  জাযীরার অধিবাসিগন হিমসের অধিবাসীদের খালিদ (রাঃ) ও উবায়দা (রাঃ) এর বিরুদ্ধে উস্কানি দিলেতারা হীত এসে জমা হয়। তখন খলীফা উমর ইবনে মালিককে হীত আক্রমণ করতে পাঠান। তিনিহারিস ইবনে ইয়াজিদকে হীত অবরোধ করতে দিয়ে কিরকিসিয়্যাহ জয় করেন। পরে হীতবাসীরাওআত্মসমর্পণ করে।জাযীরা বিজয়ঃ  ইয়ায ইবনে গানামের নেতৃত্বেএকদল মুজাহিদ জাযীরা বিজয় করেন। ইয়ায ইবনে গানাম পরে ‘রাহা’ বিজয় করেন। পরে ‘হাররান’ বিজয় করেন।‘হাররান’ থেকে উমর ইবনে যাদ রাসুল আয়ন’, আবু মুসা আসআরী ‘নসীবীন’,ইয়ায ইবনে গানাম ‘দারা’ এবং উসমান ইবনে আবদিল আস ‘আরমিনিয়া’ বিজয়করেন।

পারস্যের কাহিনিঃ  

আহওয়ায, মানাযির ও নাহার তায়রী বিজয়ঃ  মুসলিমরা ‘তুসতার’পর্যন্ত সকল রাজ্য পারসিকদের থেকে ছিনিয়ে নেন। তুসতারে সম্রাট ইয়াযদগিরদ জোর করেসাধারণ জনগন থেকে সৈন্য জমা করে। খলীফা ‘কূফা’ ও ‘বসরা’ থেকে ‘আহওয়াযে’ সৈন্যপাঠায়, তারা হরমুজানকে পরাজিত করে, হরমুজান ‘তুসতার’ পালায়। তুসতারে যুদ্ধেপ্রত্যেক মুসলিম ১০০ জন করে পারসিক সৈন্য হত্যা করে। হরমুজান বন্দী হয়, পরে তাকেখলীফার কাছে পাঠিয়ে দেয়া হয়। সে ইসলাম গ্রহন করলে খলীফা তাকে কিছু জায়গা ও ভাতাদিয়ে মুক্ত করে দেয়। বলা হয় খলীফা ওমর (রাঃ) এর হত্যাকারীর সাথে পরে এই হরমুজানেরহাত ছিল।
    
সুইস (সুস) বিজয়ঃ  তুসতারের পরসাবরা আবু মুসা আসআরি ও অন্যদের নিয়ে সুইস অবরোধ করলে সেখানকার বিজ্ঞজনেরা বলেদাজ্জাল ছাড়া এটি কেউ জয় করতে পারবে না। তখন সাফ ইবনে সায়াদ এক লাত্থি দিয়ে দরজারতালা ভেঙ্গে ভিতরে ঢুকে পরলে মুসলিমরা সুইস জয় করেন।
এদিকে ইয়াযদগির্দ ইস্পাহানে পালিয়ে যায়।

মিসর ও ইসকান্দারীয়া বিজয়ঃ  সিরিয়াবিজয়ের পর খলীফা ওমর (রাঃ) আমর ইবনে আস (রাঃ) কে মিসর ও ইসকান্দারীয়ার উদ্দেশ্যেপাঠান। তারা সেখানে গেলে ক্যাথলিক নেতা মারইয়াম ও পাদ্রী মিরইয়াম তাদের সাথে দেখাকরলে তারা তাদেরকে ইসলাম গ্রহন করতে বলেন। কিন্তু ইসকান্দারীয়ার শাসক মুকাওকাসতাদের মুসলিমদের আক্রমণ করতে বলেন এতে বুদ্ধিমান জনগন বলেন, “যে সম্প্রদায় দুটি বিশালসাম্রাজ্য রোম ও পারস্য বিজর করল তোমরা তাদের বিরুদ্ধে কিভাবে যুদ্ধ করবে”? পরেসিদ্ধান্তের বেধে দেয়া সময় শেষ হলে মুসলিমরা তাদের উপর আক্রমণ করে, এতে কিছু পাদ্রী ভয়ে মদিনাতে যেয়ে সন্ধিকরে মিসর মুসলিমদের দিয়ে দেয়। এরপর আমর (রাঃ) ইসকান্দারীয়াতে সৈন্য পাঠালেমুকাওকাস জিযিয়া করের বিনিময়ে সন্ধি করলে ইসকান্দারীয়াও বিজিত হয়। মুকাওকাস আগেরোমকে কর দিত, তাই রোম মুসলিমদের কাছে পরাজিত হয়ায় সে অনায়াসেই মুসলিমদের জিযিয়াদিতে স্বীকার করে।

নিহাওয়ান্দ বিজয়ঃ   একটার পর একটা পরাজয়ের পর সম্রাট ইয়াযদগির্দ আসে পাশের সব এলাকায় সাহায্য চাইলে ১ লাখ ৫০ হাজার সৈন্য নিয়ে ফিরযান এক বাহিনী তৈরি করে নিহাওয়ান্দের কাছে সমাগত হয়। এদি কে কূফাবাসী  সা’দ (রাঃ) বিরুদ্ধে সংগ্রাম করলে কোন কারণ ছাড়াই ওমর (রাঃ) তাকে পদচ্যুত করে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুল্লাহকে কূফায় শাসনভার দিয়ে পাঠান। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুল্লাহ খলীফা  ওমর (রাঃ)  এর কাছে সাহায্য চাইলে তিনি আন-নূমান ইবনে মুকরিন কে সেনাপতি করে নিহাওয়ান্দে প্রেরণ করেন। এক প্রচণ্ড যুদ্ধের পর আন-নূমান ঘোড়া থেকে পরে গেলে তার কোমরে তীর লাগলে তিনি শহীদ হন। হুযাইফা পতাকা তুলে নেন ও পরে তার ভাইনুয়াইমকে পতাকা তুলে দিয়ে শহীদ হয়ে যান। এ যুদ্ধে  মুসলিমদের জন্য তৈরি পরিখায় নিজেরাই পড়ে ১ লক্ষপারসিক নিহত হয়।

নুয়াইম ইবনে মুকরিম ‘হামাদান’ দখল করেন। নুয়াইম ইবনে মুকরিম এর যখন ১২ হাজার সৈন্যতখন রোম, দাইলাম, রাই ও আজারবাইজানের সৈন্যরা একত্রে ‘ওয়াজরুয’ এ হামলা করতে চাইলেনুয়াইম একা সবগুলকে পরাজিত করেন।

রাই, কোমাস, জুরজান, আজারবাইজান, আল-বাব, আরমানিয়া বিজয়ঃ নুয়াইম ইবনেমুকরিম নিজে ও সেনাবাহিনী পাঠিয়ে রাই, কোমাস ও জুরজান বিজয় করেন। আজারবাইজানেরশাসক ছিল রুস্তমের ভাই ইসকান্দিয়ায সে সন্ধির মাধ্যমে আজারবাইজান মুসলিমদের কাছেসমর্পণ করে।  ওমর (রাঃ) সুরাকাহ ইবনে আমর (রাঃ)কে আল-বাবে পাঠান। সুরাকাহ নিজে ও সেনাবাহিনী পাঠিয়ে আল-বাব ও পরে আরমানিয়া সহআশে-পাশের অনেক অঞ্চল জয় করেন। সুরাকাহ সেখানে ইন্তিকাল করলে আব্দুর রাহমান ইবনেরাবীয়াহ কে ওমর (রাঃ) সে এলাকার দায়িত্ব দিয়ে তুর্কিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্যরেখে দেন।

তুকিদের বিরুদ্ধে প্রথম জিহাদঃ আব্দুর রাহমান ইবনে রাবীয়াহ কে ওমর (রাঃ) তুর্কিদের বিরুদ্ধে অভিযানে যেতেবললে তিনি ৬৫০ মাইল দূরে বানাঞ্জারে অভিযান পরিচালনা করেন এবং কয়েকবার যুদ্ধ করেন।পরে উসমান (রাঃ) এর খিলাফত কালেও অনেকবার প্রচণ্ড যুদ্ধ হয় তুর্কিদের সাথে।
খোরাসান (আফগানিস্তান) বিজয়ঃ সম্রাট ইয়াযদগির্দ খোরাসানে পলায়ন করে। আহনাফ (রাঃ) খোরাসান বিজয় করেন। সম্রাট চিনের বাদশাকে সাহায্যকরতে বললে চিনের বাদশা মুসলিমদের ভয় পেয়ে তাকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে আর যুদ্ধ করতেনিষেধ করে।

কিরমান, সিজিস্তান ও মাকরন বিজয়ঃ
  ওমর (রাঃ) এর শাসনামলেই কিরমান, সিজিস্তানের পরমাকরনের নদী পর্যন্ত বিজয় হয় মুসলিমদের দ্বারা।

কুর্দীদের বিরুদ্ধে বিজয়ঃ  ওমর(রাঃ) এর খিলাফতকালে সর্বশেষ কুর্দীদের সাথে মুসলিমদের যুদ্ধ হয়। পরে ওমর (রাঃ) ১০বছর ৫ মাস ২১ দিনের খিলাফতে সবচেয়ে বেশি রাজ্য জয়করে সেখানে ইসলামের শান্তির বানীপৌঁছে পরলোক গমন করেন।
রাসুল (সাঃ) যখন মক্কায় ইসলাম প্রচার শুরু করেছিলেন, তখন মক্কার মুশরিক-কাফিররা সাহাবাদের এই বলে উত্যোক্ত করত যে, এরা নাকি রোম বিজয় করবে? এরা নাকি পারস্য বিজয়  করবে? ওই দেখ দেখ রোম বিজয়ী যায়, পারস্য বিজয়ী যায়, ওই দেখ দেখ পাগল যায় .......ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু এই  বাপ-দাদার  ধর্ম ত্যাগকারি, কথিত পাগলরাই মাত্র ২০-২৫ বছরের মধ্যেই রোম-পারস্যের মত দুইটা পরাশক্তিকে  ধ্বংস করে দিয়ে আফ্রিকা এবং হিন্দুস্তান ও চিনের সীমানায় ইসলামকে নিয়ে গিয়েছিল। তার কিছুদিন পরেই মাত্র ১০০ বছরের ভিতর মদিনা থেকে পশ্চিমে স্পেইন, পূর্বে  হিন্দুস্তান (ভারতীয় উপমহাদেশ) ও চিনের অনেক অঞ্চল এবং দক্ষিনে আফ্রিকাকে পরাজয় করে সেখানে ইসলাম পৌঁছে দিয়ে ইসলামিক খিলাফত রাষ্ট্রকে পৃথিবীর সবচেয়ে বৃহৎ রাষ্ট্রে পরিণত করেছিল। ১৩০০ বছর ধরে সেই রাষ্ট্রকে পরিচালিত করে সবচেয়ে স্থায়ীরাষ্ট্র হিসেবে রেকর্ড গড়ে ছিল। আজও ক্রুসেডাররা সেই খিলাফত রাষ্ট্রের নাম শুনলে জামা-কাপড় ভিজিয়ে দেয়ার মত অবস্থা করে। হ্যাঁ,  তবে আবার আসছে সেই রাষ্ট্র, খুবই নিকটে, তবে এবার আসলে এটি আর পৃথিবীর সর্ববৃহৎ রাষ্ট্র হবে না, এটি সমগ্র পৃথিবী নিয়েই গঠিত হবে, আর স্থায়ী হবে কিয়ামতপর্যন্ত।

[সূত্রঃ ১. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া  (৬ ষ্ঠ ও ৭ম খণ্ড) ...... ইবনে কাসির।
২. আর রাহীকুল মাখতূম ....... আল্লামা ছফিউর রহমান মোবারকপূরী।
৩. আসহাবে রাসুলের জীবনকথা ....  আবু বকর (রাঃ) এর জীবনী .... ড. মুহাম্মদ আবদুল মাবুদ।
৪. হেজাজের কাফেলা ...... নসীম হিজাযী।]

  by Rashedul Islam (Notes) on Monday, 10 June 2013 at 21:17